জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি : অভিযোগ, বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ।
সারসংক্ষেপ: কুরআনের একাধিক স্থানে — সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৯), সূরা ইয়াসিন (৩৬:৩৬), সূরা আয-যুখরুফ (৪৩:১২), সূরা আর-রা'দ (১৩:৩) প্রভৃতিতে — زوج/أزواج শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, কখনো সুনির্দিষ্টভাবে মানব নর-নারী প্রসঙ্গে, কখনো "প্রতিটি বস্তু" বা "সবকিছু"-র মতো ব্যাপক পরিধিতে। এই প্রবন্ধের গবেষণা-প্রশ্ন হলো: আরবি زوج শব্দের প্রকৃত শব্দার্থিক সীমা কতদূর, এবং সেই সীমাকে আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষিত দ্বৈততার প্যাটার্নের বিপরীতে পরীক্ষা করলে কী পাওয়া যায়? প্রতিটি দাবিকে তার প্রক্রিয়াগত কার্যকারণ পর্যন্ত অনুসরণ করে যাচাই করা হয়েছে, যাতে সিদ্ধান্তগুলো ভাসাভাসা সাদৃশ্যের বদলে প্রক্রিয়াগত নির্ভুলতার ওপর দাঁড়ায়। |
১. ভূমিকা
زوج-সংক্রান্ত আয়াতগুলো যেকোনো পাঠকের সামনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উপস্থাপন করে: "জোড়া" বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, এবং এই দাবিটি আধুনিক জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। এই প্রশ্নের একটি দায়িত্বশীল জবাবের জন্য কেবল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথেষ্ট নয় — প্রতিটি দাবির পেছনের প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়ার সীমা এবং সেই সীমার মধ্যে কোথায় প্রকৃত দ্বৈততা এবং কোথায় নিছক সাদৃশ্য, তা আলাদা করে দেখানো আবশ্যক। এই কারণে নিচের প্রতিটি অংশে শুধু "কী" নয়, বরং "কেন" ও "কীভাবে" প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে — যেমন কেন নিউট্রন চার্জহীন হয়েও তার প্রতিকণা আছে, কীভাবে ছত্রাকের হাজারো মেটিং টাইপ তবুও দ্বিপক্ষীয় মিলনে সীমাবদ্ধ থাকে, বা কীভাবে একটি হাইব্রিড টিকটিকি প্রজাতির উৎপত্তিতে পুরুষ-স্ত্রীর ভূমিকা লুকিয়ে থাকে।
এর জন্য তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পর-সংযুক্ত অনুসন্ধান প্রয়োজন — ক্লাসিক্যাল আরবি অভিধান ও তাফসিরে زوج-এর প্রকৃত শব্দার্থিক পরিধি এবং সেই পরিধির ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি কী, আরবি বালাগাতের রীতিতে "সবকিছু" (كل شيء)-এর যথার্থ অর্থ কীভাবে নির্ধারিত হয়, এবং প্রকৃতিতে পর্যবেক্ষিত দ্বৈততার বিভিন্ন রূপ — তাদের অন্তর্নিহিত ভৌত ও জৈবিক প্রক্রিয়াসহ — এই কাঠামোর সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ।
২.পদ্ধতিগত কাঠামো: তিন স্তরের শ্রেণিবিন্যাস
"জোড়া" ধারণাকে অস্পষ্ট ক্যাচ-অল হিসেবে না রেখে প্রতিটি দৃষ্টান্তকে তিনটি শ্রেণির একটিতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাস কেন প্রয়োজন তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। যদি "জোড়া" শব্দটিকে জৈবিক প্রজনন, আণবিক গঠন এবং বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা — এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়ের জন্য নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একটি দুর্বল দৃষ্টান্তের ব্যর্থতা (যেমন তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা) সহজেই একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্তের (যেমন DNA ক্ষারক-জোড়া) বিশ্বাসযোগ্যতাকে কলুষিত করতে পারে, এবং বিপরীতভাবে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্তের সাফল্য একটি দুর্বল দৃষ্টান্তকেও অহেতুক বৈধতা দিতে পারে। তাই প্রতিটি দৃষ্টান্তকে তার প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথক বাক্সে রাখা প্রয়োজন।
প্রথম শ্রেণি — আক্ষরিক/জৈবিক জোড়া: এখানে দুটি ভিন্ন জীব বা জীবকোষ সরাসরি প্রজনন বা জিন-বিনিময়ের একটি নির্দিষ্ট, পর্যবেক্ষণযোগ্য জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় — যেমন নর-নারীর গ্যামেট মিলন, বা ব্যাকটেরিয়ার দাতা-গ্রহীতা কোষের DNA স্থানান্তর। এই শ্রেণির যাচাই-মানদণ্ড হলো: একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ঘটনায় সত্যিই দুটি পৃথক সত্তা অংশগ্রহণ করছে কিনা, এবং সেই অংশগ্রহণের ভূমিকা কি প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন (যেমন দাতা বনাম গ্রহীতা)।
দ্বিতীয় শ্রেণি — গাঠনিক/আণবিক জোড়া: এখানে পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের কোনো মৌলিক সত্তা বা ধর্ম একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বা ভৌত সূত্রের কারণে দ্বৈতভাবে গঠিত — যেমন কণা-প্রতিকণা (চার্জ-অনুবন্ধন প্রতিসাম্যের কারণে), DNA ক্ষারক-জোড়া (হাইড্রোজেন বন্ধনের জ্যামিতিক সীমাবদ্ধতার কারণে), বা ফোটন পোলারাইজেশন (গেজ প্রতিসাম্যের কারণে)। এই শ্রেণির যাচাই-মানদণ্ড হলো: দ্বৈততাটি কি একটি প্রতিষ্ঠিত ভৌত সূত্র থেকে অনুমেয়, নাকি নিছক পর্যবেক্ষণ-নির্ভর কাকতালীয় মিল।
তৃতীয় শ্রেণি — মেটাফিজিক্যাল/দার্শনিক বৈপরীত্য: এখানে বিমূর্ত বা বিশ্বাস-ভিত্তিক ধারণা বিপরীত জোড়ায় উপস্থাপিত — যেমন ভালো-মন্দ, জান্নাত-জাহান্নাম। এই শ্রেণির কোনো পরীক্ষাগার-নির্ভর যাচাই-মানদণ্ড আপাতত নেই — এটি সম্পূর্ণরূপে টেক্সট-আভ্যন্তরীণ, শাক্ষ্য-নির্ভর ও ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল, এবং এই কারণেই এটিকে প্রথম দুটি শ্রেণি থেকে পৃথক রাখা প্রয়োজন — নয়তো একটি যুক্তি, শাক্ষ্য ও বিশ্বাস -ভিত্তিক দাবিকে ভুলবশত একটি অভিজ্ঞতামূলক বা পরিক্ষা মূলক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি থেকে যায়।

৩. ভাষাতত্ত্ব ও নাহু: زوج শব্দের মূল পরিধি
আরবি زوج (জাওজ) শব্দের শব্দার্থিক ব্যাপ্তি বোঝার জন্য ক্লাসিক্যাল ভাষাতাত্ত্বিক উৎস থেকে শুরু করা জরুরি, কারণ যেকোনো পরবর্তী তাফসিরগত বা বৈজ্ঞানিক আলোচনা এই মূল সংজ্ঞার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে। ইমাম রাগীব আল-ইসফাহানি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত অভিধান মুফরাদাত আলফায আল-কুরআন-এ এই শব্দের ব্যাপ্তি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন — যা ইমাম আলূসী (রহঃ) রূহুল মা'আনী-তে উদ্ধৃত করে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন:
"زوج শব্দটি প্রতিটি জোড়ার একটি সত্তার জন্য ব্যবহৃত হয়; আবার এমন প্রতিটি বস্তুর জন্যও ব্যবহৃত হয়, যা অন্য কোনো কিছুর সাথে সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য বা কোনো সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্ত। বরং এ জগতের প্রতিটি সৃষ্টিই কোনো না কোনো অর্থে যুগল — কখনো তার বিপরীতের কারণে, কখনো তার সদৃশের কারণে, আবার কখনো উপাদান ও আকৃতির সমন্বয়ের কারণে (تركيب صورة ومادة), বরং জওহর ও আরযের সমন্বয়ের কারণে।
এই সংজ্ঞায় তিনটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা যায়, যেগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন এবং প্রতিটির নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, বিপরীতধর্মী জোড়া (যেমন মিষ্টি-তিক্ত), যেখানে দুটি সত্তা একে অপরের বৈশিষ্ট্যগত বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। দ্বিতীয়ত, সমধর্মী জোড়া (যেমন একই প্রজাতির দুই ব্যক্তি বা একই শ্রেণির দুই সদস্য), যেখানে দুটি সত্তা সাদৃশ্যের কারণে একত্রে গণ্য হয়। তৃতীয়ত, গঠনগত দ্বৈততা (যেমন জওহর ও আরযের সমন্বয় — অর্থাৎ কোনো একক বস্তু নিজেই দুটি ভিন্ন উপাদানের একত্রীকরণে গঠিত, তাই এক অর্থে সে নিজেই একটি "জোড়া")। রাগীবের এই সংজ্ঞা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত বিন্দু স্পষ্ট করে: زوج শব্দের প্রাথমিক ও অধিক প্রচলিত অর্থ নর-নারীর জোড়া, কিন্তু এই অর্থ থেকেই একটি স্বীকৃত ভাষাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে — উপমার সম্প্রসারণ (تشبيهًا بصنف الذكر وصنف الأنثى, "নর ও মাদী প্রজাতির সাদৃশ্যে") — একটি বিস্তৃত দ্বিতীয় অর্থ উদ্ভূত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রকার বা শ্রেণিকেও زوج বলা হয়। এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াটি ভাষাতত্ত্বে সুপরিচিত — মূল অর্থ থেকে একটি নিয়মতান্ত্রিক উপমার মাধ্যমে অর্থের বিস্তৃতি ঘটা, যা কোনো স্বেচ্ছাচারী পুনর্ব্যাখ্যা নয়।

৩.১ সূরা ইয়াসিন (৩৬:৩৬)-এর ই'রাব
আয়াতটি: سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ
এখানে الْأَزْوَاجَ কুল্লাহা মাফঊল বিহ, এবং كُلَّهَا একটি তাওকীদ (জোর প্রদানকারী পদ) — যার কাজ হলো পূর্ববর্তী শব্দের ব্যাপকতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। এরপর তিনটি مِن অব্যয়ের ব্যাখ্যায় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাকরণগত পাঠ সম্ভব, এবং কোন পাঠটি গৃহীত হবে তা সরাসরি নির্ভর করে أزواج শব্দের কোন অর্থ (নর-নারী নাকি প্রকার/শ্রেণি) গ্রহণ করা হচ্ছে তার ওপর। যদি প্রথম অর্থ (নর-নারী) নেওয়া হয়, তাহলে মিন হয় ابتدائية এবং সরাসরি خلق ক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত — অর্থাৎ "উদ্ভিদ থেকে, মানুষ নিজেদের থেকে, এবং অজানা বিষয় থেকে জোড়া সৃষ্টি করা হয়েছে"। যদি দ্বিতীয় অর্থ (শ্রেণি/প্রকার) নেওয়া হয়, তাহলে মিন হয় بيانية (বর্ণনামূলক), যেখানে পরবর্তী তিনটি clause মূলত الأزواج শব্দটিরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা — অর্থাৎ "সকল প্রকারের জোড়া, যা হলো: উদ্ভিদ, মানুষ নিজেরা, এবং অজানা সৃষ্টি"।
৩.২ সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৯)-এর ই'রাব
আয়াতটি: وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণে, مِن (মিন) অব্যয়টি এখানে خَلَقْنَا-এর সাথে সম্পর্কিত এবং একে ابتدائية (আরম্ভবাচক) হিসেবে চিহ্নিত করা হয় — অর্থাৎ "প্রতিটি জিনিস থেকে শুরু করে/এর মধ্য থেকে"। زَوْجَيْنِ দ্বিবচন রূপে মাফঊল বিহ (কর্ম পদ) হিসেবে কাজ করছে, যা নির্দেশ করে প্রতিটি "শাই" (বস্তু) থেকে ঠিক দুটি সংশ্লিষ্ট সত্তা সৃষ্টি করা হয়েছে। ব্যাকরণবিদদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো, এই "মিন" আংশিকতাসূচক (تبعيضية) অর্থেও গৃহীত হতে পারে কিনা — যদি তাই হয়, তবে বাক্যাংশটির অর্থ দাঁড়ায় "সৃষ্ট জিনিসগুলোর মধ্য থেকে (আমি) যুগল সৃষ্টি করেছি", যা সরাসরি ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি সাধারণ, ব্যাপক নীতি বর্ণনা করছে — সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত আক্ষরিকভাবে গণনার দাবি নয়, বরং একটি বিস্তৃত প্রবণতার বর্ণনা।
৪. ক্লাসিক্যাল তাফসিরে زوج-এর ব্যবহার ও ব্যাখ্যার কাঠামো
এএই অংশে ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ প্রকৃতপক্ষে কী বলেছেন তা পরীক্ষা করা হয়, কারণ ভাষাতাত্ত্বিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ব্যাখ্যাকারদের প্রকৃত পাঠ পরীক্ষা করা, কেবল অভিধানের তাত্ত্বিক সম্ভাবনার ওপর নির্ভর না করা। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, একই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ সুনির্দিষ্টভাবে মতভেদ করেছেন, এবং সেই মতভেদের সম্পূর্ণ মানচিত্র আঁকা ছাড়া কোনো বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না — একটি মাত্র মুফাসসিরের একটি মাত্র বাক্য উদ্ধৃত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো পদ্ধতিগতভাবে অপর্যাপ্ত।
৪.১ সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৯)-এর তাফসির — মতভেদ ও অগ্রাধিকার
ইমাম আত-তাবারী (রহঃ) তাঁর তাফসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় দুটি প্রধান মত সংগ্রহ করেছেন এবং সুস্পষ্টভাবে একটির পক্ষে অগ্রাধিকার প্রকাশ করেছেন — যা তাঁর তাফসির-পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, কারণ তিনি কেবল মতভেদ তালিকাভুক্ত করেই থামেননি, বরং যুক্তি দিয়ে একটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
প্রথম মত (ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত): "যুগল" বলতে শুধু পুরুষ ও নারী বোঝানো হয়েছে। এই মতের সমর্থনে ইবনে যায়েদ সূরা তাহরীমের একটি আয়াতও উদ্ধৃত করেন, যেখানে زوجه শব্দটি সরাসরি "তার স্ত্রী" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয় মত (মুজাহিদ ইবনে জাবর রহঃ থেকে বর্ণিত): এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে কুফর ও ঈমান, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য, হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা, রাত ও দিন, আকাশ ও পৃথিবী, জিন ও মানুষ। এছাড়া হাসান আল-বাসরী থেকে সূর্য-চন্দ্রের উদাহরণও পৃথকভাবে বর্ণিত।
তাবারী স্পষ্টভাবে মুজাহিদের মতকে অধিক গ্রহণযোগ্য (أولى) ঘোষণা করেছেন, এবং তাঁর যুক্তিটি কেবল একটি মতামত নয় বরং একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা-নীতি — যা এই প্রবন্ধের পুরো বিশ্লেষণের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে:
"আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার জন্য একটি দ্বিতীয় সত্তা সৃষ্টি করেছেন, যা কোনো না কোনো দিক থেকে প্রথমটির বিপরীত বা ভিন্ন — এ কারণেই প্রত্যেকটি অপরটির যুগল (زوج) নামে পরিচিত। এর দ্বারা আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন — তিনি এমন নন যে কেবল এক ধরনের কাজই করতে পারেন, যেমন আগুন যার স্বভাব শুধু উত্তাপ প্রদান, তা শীতল করতে পারে না; আবার বরফ যার স্বভাব শুধু শীতল করা, তা উত্তাপ দিতে পারে না। যে কেবল একটি কাজই করতে পারে, তাকে পরিপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী বলা যায় না। পূর্ণ প্রশংসা ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা কেবল তাঁরই, যিনি ইচ্ছামতো সব ধরনের — পরস্পর ভিন্ন কিংবা সাদৃশ্যপূর্ণ — সবকিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম।" (তাফসীর আত-তাবারী, ২২/৪৪০)
এই যুক্তির কাঠামোটি লক্ষণীয় — তাবারী "জোড়া" ধারণাটিকে সরাসরি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করছেন, একটি সংকীর্ণ জীববৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে নয়। তাঁর যুক্তিতে "জোড়া" মানে এই ক্ষমতার একটি বহুমুখী প্রকাশ — যা এক ধরনের সীমাবদ্ধতা (যেমন আগুন কেবল গরম করতে পারে) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি সত্তার প্রমাণ।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) এই আয়াতে একটি বিস্তৃত তালিকা প্রদান করেন: আকাশ-পৃথিবী, রাত-দিন, চন্দ্র-সূর্য, ভূমি-সমুদ্র, সমতল-পর্বত, শীত-গ্রীষ্ম, জিন-মানুষ, পুরুষ-নারী, আলো-অন্ধকার, ঈমান-কুফর, সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, সত্য-মিথ্যা, মিষ্টি-তিক্ত (তাফসীর ইবনে কাসীর, ৭/৪২৪)। তাঁর ব্যাখ্যায় এই জোড়াগুলোর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন বোঝে "যুগলসমূহের স্রষ্টা নিজে একক, অদ্বিতীয়" — অর্থাৎ প্রতিটি জোড়ার উদাহরণ শেষ পর্যন্ত একটি একক তাওহিদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মাধ্যম, নিজে থেকে কোনো স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক দাবি নয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্য। ইমাম ইবনে আশূর (রহঃ) তাঁর আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর-এ ৫১:৪৯ আয়াতের জন্য নর-নারী অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, এবং তাঁর যুক্তি একটি সুনির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিক কারণ ভিত্তিক — তিনি লক্ষ্য করেন যে زوجين এখানে বিশেষভাবে দ্বিবচন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে, যার উদ্দেশ্য "যাতে তাদের মিলনের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টির সূচনা হয়" — এবং এই আয়াতটি প্রাসঙ্গিকভাবে পুনরুত্থানের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত, যেখানে প্রথম সৃষ্টির নর-নারী মিলন পরবর্তী জন্মের সাক্ষ্য বহন করে, ঠিক যেমন প্রথমবার সৃষ্টি সম্ভব হলে দ্বিতীয়বার (পুনরুত্থান) সৃষ্টিও সম্ভব। এই ব্যাখ্যাও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য, তবে তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগভীর মতো অধিকাংশ মুফাসসির ব্যাপক তালিকা-নির্ভর ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে এই ব্যাপক পাঠটি প্রান্তিক নয় বরং তাফসিরের মূলধারার একটি অংশ।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) মুজাহিদের তালিকাকে সমর্থন জানিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক সংযোজন করেন —
এর উদ্দেশ্য "যুগলসমূহের স্রষ্টা একক" এই সত্য প্রতিষ্ঠা করা, তাই তাঁর সত্তায় গতি-স্থিরতা, আলো-অন্ধকার, শুরু-শেষ — কোনো সৃষ্ট বৈপরীত্যই আরোপ করা যায় না, কারণ তিনি স্বয়ং "ওয়িতর" (একক, বিজোড়) — তাঁর কোনো সদৃশ নেই (তাফসীর আল-কুরতুবী, ১৭/৫০)।
আদ-দুররুল মানসূর-এ ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযিরের সূত্রে মুজাহিদের বর্ণনা স্বতন্ত্রভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, যা এই ব্যাপক ব্যাখ্যার সনদগত ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করে — অর্থাৎ এই ব্যাখ্যাটি কেবল একজন মুফাসসিরের একক মতামত নয়, বরং একাধিক স্বতন্ত্র সনদ-শৃঙ্খলার মাধ্যমে সংরক্ষিত সালাফদের ব্যাখ্যা।
সূরা ইয়াসিন (৩৬:৩৬)-এর তাফসির — দুটি পাঠের সংকলন
এই আয়াতে ইমাম ইবনে আশূর (রহঃ) দুটি সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা-পদ্ধতি পাশাপাশি রেখে পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, যা এই আয়াতের বহুস্তরীয় পাঠযোগ্যতা প্রমাণ করে।
প্রথম পাঠ (রাগীবের মতে আরও প্রচলিত):
أزواج মানে পুরুষ ও নারী — প্রাণিজগতের নর-মাদী। এই পাঠে তিনটি مِن-ই ابتدائية, এবং আয়াতটি প্রজনন-সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর একত্বের একটি প্রত্যক্ষ, দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে — মানুষ প্রতিদিন নিজের চোখে যা দেখে তার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার প্রমাণ উপস্থাপন করা।
দ্বিতীয় পাঠ: أزواج মানে বিভিন্ন প্রকার ও শ্রেণি — যেমন সূরা ত্বহা (৫৩)-তে أزواجًا مِن نباتٍ شتى ("বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ") ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে কোনো লিঙ্গগত অর্থ প্রাসঙ্গিক নয়। এই পাঠে তিনটি مِن-ই بيانية (বর্ণনামূলক) — অর্থাৎ পরবর্তী তিনটি অংশ আসলে الأزواج শব্দেরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা, যেন বলা হচ্ছে "সমস্ত প্রকার — যা হলো উদ্ভিদ, মানুষ নিজেরা, এবং অজানা সৃষ্টি"।
ইবনে আশূর বলেন,
রাগীবের মতে প্রথম অর্থটিই অধিক প্রচলিত ব্যবহারে (كثير)। তবে তিনি এই সিদ্ধান্তে থামেননি — তিনি দ্বিতীয় অর্থকেও সমান ভাষাতাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে উভয় পাঠেই আয়াতের মূল বালাগী উদ্দেশ্য — আল্লাহর একত্বের প্রমাণ — অক্ষুণ্ণ থাকে, কোনো পাঠই এই মূল বার্তাকে দুর্বল করে না।
তাফসীরে জালালাইন ৩৬:৩৬-এর ব্যাখ্যায় সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
الأصناف — "সকল প্রকার"। উদ্ভিদ থেকে (শস্য ও অন্যান্য), মানুষের নিজেদের মধ্য থেকে (পুরুষ ও নারী), এবং "من المخلوقات العجيبة الغريبة" — এমন সব বিস্ময়কর ও অপরিচিত সৃষ্টি থেকেও, যাদের সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই নেই।
লক্ষণীয়, এই সংক্ষিপ্ত তাফসিরেও তিনটি ভিন্ন উৎস (উদ্ভিদ, মানুষ, অজানা) একসাথে গণনা করা হয়েছে, যা একটি ব্যাপক শ্রেণিবিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
ইমাম তাবারী ৩৬:৩৬-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন:
"يقول تعالى ذكره تنزيهًا وتبرئةً للذي خلق الألوان المختلفة كلها" — অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র ঘোষণা করছেন নিজেকে, যিনি বিভিন্ন প্রকার ও রং (الألوان المختلفة) সৃষ্টি করেছেন। এখানে "আলওয়ান" শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় — এটি আক্ষরিক অর্থে "রং" হলেও প্রসঙ্গে এটি "প্রকার/বৈচিত্র্য" অর্থে ব্যবহৃত, যা আরও একবার প্রমাণ করে ক্লাসিক্যাল তাফসিরে زوج/أزواج সংক্রান্ত আলোচনা "বৈচিত্র্য" ধারণার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত।
ইমাম আলূসী (রহঃ) রূহুল মা'আনী-তে রাগীবের সংজ্ঞা উদ্ধৃত করার পর নিজস্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য যোগ করেন:
"বরং এই জগতের সবকিছুই কোনো না কোনো অর্থে 'যুগল' — হয় বিপরীতের কারণে, নয় সদৃশের কারণে, নয়তো উপাদান-আকৃতি (صورة ومادة) বা জওহর-আরযের (جوهر وعرض) সমন্বয়ের কারণে।"
এই মন্তব্যটি একটি দার্শনিক গভীরতা যোগ করে — এখানে "জোড়া" ধারণাকে শুধু বাহ্যিক জোড়া-সৃষ্টির বাইরে গিয়ে প্রতিটি সত্তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ গঠনের (matter-form composition) মধ্যেও প্রয়োগ করা হয়েছে — যা মধ্যযুগীয় ইসলামি দর্শনের হিলোমরফিক (hylomorphic) কাঠামোর সাথে সংগতিপূর্ণ।
ইমাম রাযী (রহঃ) তাফসীরে কবীর-এ একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক-যুক্তিবিদ্যাগত সংযোজন করেছেন। তিনি বলেন,
যুক্তিবিদদের পরিভাষায় 'শাই' (বস্তু) মানে 'জিনস' (গণ), এবং যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গণের অধীনে ন্যূনতম দুটি প্রকার (نوع) থাকতে হয় — অন্যথায় সেই গণকে উপবিভক্ত করার কোনো অর্থ থাকে না।
এই যুক্তিবিদ্যাগত কাঠামো প্রয়োগ করে তিনি একটি ক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস উপস্থাপন করেন: জওহর (সত্তা) থেকে বস্তুগত (মাদ্দী) ও অবস্তুগত (মুজাররাদ) প্রকার; বস্তুগত থেকে বৃদ্ধি-প্রাপ্ত (নামী) ও জড় (জামিদ); বৃদ্ধি-প্রাপ্ত থেকে অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন (মুদরিক) ও উদ্ভিদ; অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন থেকে বাকশক্তিসম্পন্ন (নাতিক) ও নির্বাক (সামিত)। এই প্রতিটি স্তরে সৃষ্টিজগৎ বাইনারিভাবে বিভক্ত হচ্ছে, এবং রাযী এই সমগ্র শ্রেণিবিন্যাস-কাঠামোকে "জোড়া" নীতির একটি প্রামাণ্য দার্শনিক ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রমাণ করে আল্লাহ একক — কারণ তিনি নিজে কোনো গণের অধীন নন, তাই তাঁর কোনো "জোড়া" থাকতে পারে না।
৪.২ সূরা ইয়াসিন (৩৬:৩৬)-এর তাফসির — দুটি পাঠের সংকলন
এই আয়াতে ইমাম ইবনে আশূর (রহঃ) দুটি সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা-পদ্ধতি পাশাপাশি রেখে পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, যা এই আয়াতের বহুস্তরীয় পাঠযোগ্যতা প্রমাণ করে।
প্রথম পাঠ (রাগীবের মতে আরও প্রচলিত): أزواج মানে পুরুষ ও নারী — প্রাণিজগতের নর-মাদী। এই পাঠে তিনটি مِن-ই ابتدائية, এবং আয়াতটি প্রজনন-সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর একত্বের একটি প্রত্যক্ষ, দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে — মানুষ প্রতিদিন নিজের চোখে যা দেখে তার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার প্রমাণ উপস্থাপন করা।
দ্বিতীয় পাঠ: أزواج মানে বিভিন্ন প্রকার ও শ্রেণি — যেমন সূরা ত্বহা (৫৩)-তে أزواجًا مِن نباتٍ شتى ("বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ") ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে কোনো লিঙ্গগত অর্থ প্রাসঙ্গিক নয়। এই পাঠে তিনটি مِن-ই بيانية (বর্ণনামূলক) — অর্থাৎ পরবর্তী তিনটি অংশ আসলে الأزواج শব্দেরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা, যেন বলা হচ্ছে "সমস্ত প্রকার — যা হলো উদ্ভিদ, মানুষ নিজেরা, এবং অজানা সৃষ্টি"।
ইবনে আশূর বলেন রাগীবের মতে প্রথম অর্থটিই অধিক প্রচলিত ব্যবহারে (كثير)। তবে তিনি এই সিদ্ধান্তে থামেননি — তিনি দ্বিতীয় অর্থকেও সমান ভাষাতাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে উভয় পাঠেই আয়াতের মূল বালাগী উদ্দেশ্য — আল্লাহর একত্বের প্রমাণ — অক্ষুণ্ণ থাকে, কোনো পাঠই এই মূল বার্তাকে দুর্বল করে না।
তাফসীরে জালালাইন ৩৬:৩৬-এর ব্যাখ্যায় সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: الأصناف — "সকল প্রকার"। উদ্ভিদ থেকে (শস্য ও অন্যান্য), মানুষের নিজেদের মধ্য থেকে (পুরুষ ও নারী), এবং "من المخلوقات العجيبة الغريبة" — এমন সব বিস্ময়কর ও অপরিচিত সৃষ্টি থেকেও, যাদের সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই নেই। লক্ষণীয়, এই সংক্ষিপ্ত তাফসিরেও তিনটি ভিন্ন উৎস (উদ্ভিদ, মানুষ, অজানা) একসাথে গণনা করা হয়েছে, যা একটি ব্যাপক শ্রেণিবিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
ইমাম তাবারী ৩৬:৩৬-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: "يقول تعالى ذكره تنزيهًا وتبرئةً للذي خلق الألوان المختلفة كلها" — অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র ঘোষণা করছেন নিজেকে, যিনি বিভিন্ন প্রকার ও রং (الألوان المختلفة) সৃষ্টি করেছেন। এখানে "আলওয়ান" শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় — এটি আক্ষরিক অর্থে "রং" হলেও প্রসঙ্গে এটি "প্রকার/বৈচিত্র্য" অর্থে ব্যবহৃত, যা আরও একবার প্রমাণ করে ক্লাসিক্যাল তাফসিরে زوج/أزواج সংক্রান্ত আলোচনা "বৈচিত্র্য" ধারণার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত।
ইমাম আলূসী (রহঃ) রূহুল মা'আনী-তে রাগীবের সংজ্ঞা উদ্ধৃত করার পর নিজস্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য যোগ করেন: "বরং এই জগতের সবকিছুই কোনো না কোনো অর্থে 'যুগল' — হয় বিপরীতের কারণে, নয় সদৃশের কারণে, নয়তো উপাদান-আকৃতি (صورة ومادة) বা জওহর-আরযের (جوهر وعرض) সমন্বয়ের কারণে।" এই মন্তব্যটি একটি দার্শনিক গভীরতা যোগ করে — এখানে "জোড়া" ধারণাকে শুধু বাহ্যিক জোড়া-সৃষ্টির বাইরে গিয়ে প্রতিটি সত্তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ গঠনের (matter-form composition) মধ্যেও প্রয়োগ করা হয়েছে — যা মধ্যযুগীয় ইসলামি দর্শনের হিলোমরফিক (hylomorphic) কাঠামোর সাথে সংগতিপূর্ণ।
ইমাম রাযী (রহঃ) তাফসীরে কবীর-এ একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক-যুক্তিবিদ্যাগত সংযোজন করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তিবিদদের পরিভাষায় 'শাই' (বস্তু) মানে 'জিনস' (গণ), এবং যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গণের অধীনে ন্যূনতম দুটি প্রকার (نوع) থাকতে হয় — অন্যথায় সেই গণকে উপবিভক্ত করার কোনো অর্থ থাকে না। এই যুক্তিবিদ্যাগত কাঠামো প্রয়োগ করে তিনি একটি ক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস উপস্থাপন করেন: জওহর (সত্তা) থেকে বস্তুগত (মাদ্দী) ও অবস্তুগত (মুজাররাদ) প্রকার; বস্তুগত থেকে বৃদ্ধি-প্রাপ্ত (নামী) ও জড় (জামিদ); বৃদ্ধি-প্রাপ্ত থেকে অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন (মুদরিক) ও উদ্ভিদ; অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন থেকে বাকশক্তিসম্পন্ন (নাতিক) ও নির্বাক (সামিত)। এই প্রতিটি স্তরে সৃষ্টিজগৎ বাইনারিভাবে বিভক্ত হচ্ছে, এবং রাযী এই সমগ্র শ্রেণিবিন্যাস-কাঠামোকে "জোড়া" নীতির একটি প্রামাণ্য দার্শনিক ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রমাণ করে আল্লাহ একক — কারণ তিনি নিজে কোনো গণের অধীন নন, তাই তাঁর কোনো "জোড়া" (নোদ্বিতীয়) থাকতে পারে না।
৪.৩ সামগ্রিক তাফসির-চিত্র থেকে যা প্রমাণিত হয়
প্রথমত, নর-নারী অর্থ এবং ব্যাপক শ্রেণি/প্রকার অর্থ — উভয়ই ক্লাসিক্যাল তাফসিরে স্বীকৃত, পরস্পরবিরোধী নয়।
দ্বিতীয়ত, তাবারী, কুরতুবী, ইবনে কাসীর, বাগভী — এই চার প্রধান মুফাসসির ৫১:৪৯-এর জন্য ব্যাপক তালিকা-নির্ভর ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইবনে আশূরের বিকল্প পাঠ সততার সাথে উল্লেখযোগ্য
তৃতীয়ত, আলূসী ও রাযীর সূত্রে রাগীবের সংজ্ঞা প্রমাণ করে — زوج শব্দের ব্যাপক অর্থ একটি আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যা নয়, এটি প্রাক-আধুনিক ইসলামি ভাষাতত্ত্বের সুপ্রতিষ্ঠিত অংশ।
চতুর্থত, আয়াতের মূল বালাগী উদ্দেশ্য — তাবারী, ইবনে কাসীর, রাযী, আলূসী প্রত্যেকের কাছেই — জীববিজ্ঞানের তথ্য সরবরাহ নয়, বরং আল্লাহর একত্ব ও সর্বশক্তিমানতার প্রমাণ।
৫. প্রসঙ্গ-নির্ভর বহুঅর্থবোধকতা: নির্দিষ্ট ও ব্যাপক আয়াতের পার্থক্য
সূরা আন-নাজম (৫৩:৪৫) ও সূরা আল-কিয়ামাহ (৭৫:৩৯)-এ স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে "তিনি যুগল সৃষ্টি করেন — নর ও নারী।" এই আয়াত দুটির প্রসঙ্গগত অবস্থান লক্ষণীয় — উভয়ই সরাসরি মানব ভ্রূণতত্ত্বের ধারাবাহিক আলোচনার (নুতফাহ বা বীর্যবিন্দু থেকে সৃষ্টির প্রক্রিয়া) একটি অংশ হিসেবে উপস্থিত, যেখানে নর-নারী প্রজনন প্রসঙ্গক্রমেই প্রাসঙ্গিক এবং একমাত্র সম্ভাব্য পাঠ। এখানে প্রথম শ্রেণির (জৈবিক) একটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট, অবিতর্কিত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় — যেকোনো ব্যাখ্যা-পদ্ধতিই এই দুটি আয়াতে নর-নারী অর্থ গ্রহণ করবে।
বিপরীতে, ৩৬:৩৬ ও ৫১:৪৯-এর প্রসঙ্গগত অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন — উভয় আয়াতই "প্রতিটি জিনিস" (كل شيء) বা "সকল যুগল" (الأزواج كلها)-এর মতো একটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাপক পরিধি নির্দেশক পদ ব্যবহার করে, যা আয়াতের প্রকৃতিকেই একটি সাধারণ নীতির ঘোষণায় রূপান্তরিত করে, নির্দিষ্ট মানব-প্রজনন সংক্রান্ত মন্তব্যে নয়। পূর্ববর্তী অংশে আলোচিত প্রতিটি মুফাসসিরই এই ব্যাপক প্রসঙ্গে زوج-কে প্রকার/শ্রেণি অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন — এবং এই ব্যাখ্যা-পদ্ধতি প্রসঙ্গের প্রকৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ।
এই পার্থক্যকে বোঝার জন্য ভাষাবিজ্ঞানের একটি সাধারণ নীতি প্রাসঙ্গিক — প্রসঙ্গ-নির্ভর বহুঅর্থতা (context-dependent polysemy)। যেকোনো প্রাকৃতিক ভাষায় একটি শব্দের একাধিক প্রযোজ্য অর্থ থাকতে পারে, এবং কোন অর্থটি একটি নির্দিষ্ট বাক্যে সক্রিয় তা নির্ধারিত হয় সেই বাক্যের অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গ দ্বারা, শব্দটির অন্যত্র ব্যবহৃত অর্থ দিয়ে নয়। এই নীতিটি কোনো ব্যতিক্রম বা বিশেষ ছাড় নয়; এটি ভাষার একটি সর্বজনীন কার্যপ্রণালী, যা আরবি সহ প্রতিটি ভাষায় সমানভাবে প্রযোজ্য।
৬. "কুল্লু শাইয়িন" কি গাণিতিক সর্বজনীনতা বোঝায় ?
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো — كل شيء (সবকিছু) বললে কি এর অর্থ আক্ষরিকভাবে, কোনো একক ব্যতিক্রম ছাড়াই, প্রতিটি সত্তা বোঝাতে বাধ্য? এই প্রশ্নের জবাব কুরআনের নিজস্ব ভাষাগত ব্যবহার থেকেই পাওয়া যায়, বাইরের কোনো তত্ত্ব আরোপ করার প্রয়োজন নেই।
কুরআন নিজেই ২৭:২৩ আয়াতে একই বাক্যাংশ "مِن كُلِّ شَيْءٍ" ব্যবহার করেছে রানী বিলকিস সম্পর্কে — হুদহুদ পাখি সুলাইমান (আঃ)-কে জানায় যে বিলকিসকে "প্রত্যেক বস্তু থেকে" দেওয়া হয়েছে। এখানে যদি এই বাক্যাংশকে আক্ষরিক, গাণিতিক সর্বজনীনতা হিসেবে পড়া হয়, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় বিলকিসকে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু — সূর্য, নক্ষত্র, এমনকি সুলাইমানের নিজের রাজত্ব পর্যন্ত — দেওয়া হয়েছিল, যা স্পষ্টতই অসম্ভব ও প্রসঙ্গের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। কোনো মুফাসসিরই এই আয়াত থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি; সর্বসম্মতভাবে এটিকে বিলকিসের রাজকীয় ক্ষমতা, সম্পদ ও মর্যাদার একটি ব্যাপক, জোরালো বর্ণনা হিসেবে বোঝা হয়। এটি কুরআনের নিজস্ব ভাষাগত ব্যবহার থেকেই প্রমাণিত একটি টেক্সট-আভ্যন্তরীণ দৃষ্টান্ত — যদি ৫১:৪৯-এর "كُلِّ شَيْءٍ"-কে গাণিতিক, ব্যতিক্রমহীন সর্বজনীনতা হিসেবে পড়তে হয়, সঙ্গতিপূর্ণতার খাতিরে ২৭:২৩-কেও একই কঠোর মানদণ্ডে পড়তে হবে — যা স্পষ্টতই অযৌক্তিক ফলাফলে পৌঁছায়।
ইমাম রাযী (রহঃ) এই বিষয়ে ৩৬:৩৬ আয়াতের প্রেক্ষিতে একটি অতিরিক্ত সূক্ষ্ম ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে আয়াতে "مما تنبت الأرض ومن أنفسهم ومما لا يعلمون" — এই তিনটি নির্দিষ্ট উপাদানের ধারাবাহিক উল্লেখ كلها (সবগুলো) শব্দের ব্যাপক অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দেয় না, বরং বিপরীতে বিভিন্ন শ্রেণির উদাহরণ ধারাবাহিকভাবে গণনা করার মাধ্যমে সেই ব্যাপক অর্থকেই আরও দৃঢ়ভাবে জোরালো করে (تأكيد العموم)। তিনি এর সমর্থনে একটি ভাষাতাত্ত্বিক উদাহরণ দেন — যদি কেউ বলে "আমি তাকে সব ধরনের জিনিস দিয়েছি — পশু, কাপড়, দাস-দাসী", তাহলে এখানে নির্দিষ্ট শ্রেণির তালিকা "সব" শব্দের অর্থকে সংকীর্ণ করে না, বরং শ্রোতাকে বোঝায় যে এই "সব" ঠিক কতটা ব্যাপক তা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করা হচ্ছে।
৩৬:৩৬-এ "مما تنبت الأرض ومن أنفسهم ومما لا يعلمون" — এই তিনটি উপাদানের পরবর্তী উল্লেখ كلها-কে সীমাবদ্ধ করে না, বরং বিভিন্ন শ্রেণি গণনা করে ব্যাপক অর্থকেই জোরালো করে (تأكيد العموم)। উদাহরণ: "আমি তাকে সব ধরনের জিনিস দিয়েছি — পশু, কাপড়, দাস-দাসী" — এখানে শ্রেণির তালিকা 'সব' অর্থকে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জোরালো করে।
৭. প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আলোকে زوج ধারণার মূল্যায়ন
উপরের ভাষাতাত্ত্বিক ও তাফসিরগত বিশ্লেষণ থেকে একটি ব্যাপক শব্দার্থিক কাঠামো ("زوج = প্রকার/দ্বৈততা, কেবল লিঙ্গ নয়") প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অংশে সেই কাঠামোকে §২-এর তিন-স্তরীয় শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করে পদার্থবিজ্ঞান থেকে প্রাণিবিজ্ঞান পর্যন্ত পর্যবেক্ষিত দ্বৈততার প্যাটার্নের বিপরীতে পরীক্ষা করা হয়েছে — প্রথমে মৌলিক কণা-পদার্থবিজ্ঞান (দ্বিতীয় শ্রেণি), তারপর ক্রমান্বয়ে অণুজীব, উদ্ভিদ, ছত্রাক ও প্রাণী (প্রথম শ্রেণি)।
৭.১পদার্থবিজ্ঞান (ক): চার্জ-নিরপেক্ষ কণা ও প্রতিকণার প্রশ্ন
.webp)
"চার্জ-নিরপেক্ষ কণার জোড়া নেই" বা "চার্জ-নিরপেক্ষ কণার প্রতিকণা থাকে না’—এই এই দাবিতে একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক বিভ্রান্তি নিহিত আছে, যা স্পষ্ট করা প্রয়োজন: বৈদ্যুতিক আধান-নিরপেক্ষতা এবং প্রতিকণার অনুপস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারণা, এবং একটির উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যটির অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না। একটি কণা বৈদ্যুতিকভাবে নিরপেক্ষ হওয়ার অর্থ কেবল এই যে তার নেট বৈদ্যুতিক চার্জ শূন্য — কিন্তু কণা-প্রতিকণা পার্থক্য বৈদ্যুতিক চার্জ ছাড়াও অন্যান্য সংরক্ষিত কোয়ান্টাম রাশি দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে।
নিউট্রন: নিউট্রন চার্জহীন হলেও এর স্বতন্ত্র প্রতিকণা — অ্যান্টিনিউট্রন — ১৯৫৬ সালে কর্ক, ল্যাম্বার্টসন, পিচিওনি ও ওয়েনজেল বেভাট্রনে শনাক্ত করেন (Cork et al., 1956), যা ব্যারিয়ন সংখ্যা ও চৌম্বক ভ্রামক দিয়ে নিউট্রন থেকে পৃথকীকৃত। নিউট্রিনোরও প্রতিকণা — অ্যান্টিনিউট্রিনো — লেপ্টন সংখ্যা দিয়ে পৃথকীকৃত; ১৯৫৬ সালে রেইনস ও কাওয়ানের প্রথম শনাক্তকরণ (Reines & Cowan, 1956) এবং কাওয়ান ও সহকর্মীদের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ (Cowan et al., 1956) — উভয়ই প্রযুক্তিগতভাবে অ্যান্টিনিউট্রিনো শনাক্ত করে, যা এই দুই সত্তার পরীক্ষাগার-নিশ্চিত পার্থক্যের প্রমাণ। একটি খোলা প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে — নিউট্রিনো ডিরাক না মায়োরানা কণা — যার নিষ্পত্তির জন্য neutrinoless double-beta decay পরীক্ষা চলমান (GERDA Collaboration, 2020); তবে বর্তমান প্রায়োগিক পদার্থবিজ্ঞান এই দুই সত্তাকে স্বতন্ত্রভাবেই গণ্য করে।
নিউট্রিনো: নিউট্রিনোরও প্রতিকণা — অ্যান্টিনিউট্রিনো — লেপ্টন সংখ্যা দিয়ে পৃথকীকৃত; ১৯৫৬ সালে রেইনস ও কাওয়ানের প্রথম শনাক্তকরণ (Reines & Cowan, 1956) এবং কাওয়ান ও সহকর্মীদের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ (Cowan et al., 1956) — উভয়ই প্রযুক্তিগতভাবে অ্যান্টিনিউট্রিনো শনাক্ত করে, যা এই দুই সত্তার পরীক্ষাগার-নিশ্চিত পার্থক্যের প্রমাণ। একটি খোলা প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে — নিউট্রিনো ডিরাক না মায়োরানা কণা — যার নিষ্পত্তির জন্য neutrinoless double-beta decay পরীক্ষা চলমান (GERDA Collaboration, 2020); তবে বর্তমান প্রায়োগিক পদার্থবিজ্ঞান এই দুই সত্তাকে স্বতন্ত্রভাবেই গণ্য করে
৭.২পদার্থবিজ্ঞান (খ): স্ব-প্রতিসম কণা — সৎ স্বীকৃতি ও বিকল্প দ্বৈততা

কণা-পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী প্রতিটি কণার একটি প্রতিকণা (antiparticle) থাকে, যার ভর সমান কিন্তু চার্জ ও অন্যান্য কোয়ান্টাম সংখ্যা (যেমন লেপ্টন সংখ্যা, ব্যারিয়ন সংখ্যা) বিপরীত। তবে এই নিয়মের একটি সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যতিক্রম আছে — কিছু কণা "স্ব-প্রতিসম" (self-conjugate), অর্থাৎ এরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিকণা। ফোটন এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ; দুর্বল নিউক্লিয় বলের বাহক Z বোসন এবং ভর প্রদানকারী হিগস বোসনও একই শ্রেণিভুক্ত। এই তিনটি কণারই কোনো "অ্যান্টি-ফোটন", "অ্যান্টি-Z" বা "অ্যান্টি-হিগস" নেই, কারণ এদের সব সংরক্ষিত কোয়ান্টাম সংখ্যা (বৈদ্যুতিক চার্জ, লেপ্টন সংখ্যা, ব্যারিয়ন সংখ্যা) ইতিমধ্যেই শূন্য — ফলে চার্জ-অনুবন্ধন (charge conjugation, C-অপারেটর প্রয়োগ) কণাটিকে অপরিবর্তিত রাখে। এই পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ সঠিক, এবং কোনো দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ একে অস্বীকার বা পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না — বরং এটি এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
প্যাটার্নের প্রকৃত সুযোগ নির্ধারণ

এই আপত্তির জবাবে প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি তা হলো — কণা-প্রতিকণা দ্বৈততার দাবিটি ঠিক কী পরিধিতে প্রযোজ্য, তা নির্ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত করা। এই দাবি কখনোই এই রূপে ছিল না যে "মহাবিশ্বের প্রতিটি একক কণা, ব্যতিক্রমহীনভাবে, তার নিজস্ব আলাদা প্রতিকণা ধারণ করবে।" প্রকৃত প্যাটার্নটি স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণা-শ্রেণিবিন্যাসের গঠনের মধ্যেই নিহিত।
পদার্থ-কণা (matter particles), অর্থাৎ ফার্মিয়ন — ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, নিউট্রিনো এবং তাদের ভারী সংস্করণ (মিউয়ন, টাউ ইত্যাদি) — এদের প্রত্যেকের একটি স্বতন্ত্র, পরীক্ষাগারে পৃথকভাবে শনাক্তযোগ্য প্রতিকণা আছে, কারণ এই কণাগুলোর বৈদ্যুতিক চার্জ বা লেপ্টন/ব্যারিয়ন সংখ্যা শূন্য নয় (নিউট্রিনো ব্যতিক্রম, যা পূর্ববর্তী অংশে আলোচিত হয়েছে)। এই দ্বৈততার তাত্ত্বিক ভিত্তি পল ডিরাকের ১৯২৮ সালের আপেক্ষিক তরঙ্গ সমীকরণ থেকে উদ্ভূত — ডিরাক ইলেকট্রনের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গাণিতিকভাবে দেখান যে সমীকরণের সমাধানে ঋণাত্মক-শক্তির অবস্থাও থাকতে হবে, যা পরবর্তীতে একটি নতুন, ইলেকট্রনের বিপরীত চার্জবিশিষ্ট কণার অস্তিত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় (Dirac, 1928)। এই ভবিষ্যদ্বাণী ১৯৩২ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কসমিক রশ্মির ক্লাউড-চেম্বার পরীক্ষায় পজিট্রন (ইলেকট্রনের প্রতিকণা) শনাক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত করেন (Anderson, 1933)।
বিপরীতে, বল-বাহক কণা (force-carrying bosons)-এর মধ্যে যেগুলো "সত্যিকারের নিরপেক্ষ" — অর্থাৎ যাদের কোনো সংরক্ষিত চার্জই নেই — সেগুলো স্ব-প্রতিসম হওয়াটা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একটি প্রত্যাশিত, গাণিতিকভাবে অনিবার্য ফলাফল, কোনো ব্যতিক্রম বা "ফাঁক" নয়। এটি কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির একটি সুপ্রতিষ্ঠিত, গাণিতিকভাবে সংগতিপূর্ণ উপশ্রেণি। অর্থাৎ কণা-প্রতিকণা দ্বৈততার নিয়মটি ভাঙছে না; বরং নিয়মটির নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই এই উপশ্রেণির অস্তিত্ব পূর্বনির্ধারিত।
পোলারাইজেশন দ্বৈততা: ফোটনের অভ্যন্তরীণ বাইনারি কাঠামো
তবে ফোটনের ক্ষেত্রে কণা-প্রতিকণা দ্বৈততার বাইরেও একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে যাচাইযোগ্য, ব্যতিক্রমহীন দ্বৈত-কাঠামো বিদ্যমান — যা কণাটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোয়ান্টাম গঠনের অংশ। প্রতিটি একক ফোটনের, ব্যতিক্রম ছাড়াই, ঠিক দুটি স্বাধীন পোলারাইজেশন (বা হেলিসিটি) অবস্থা থাকে।
এই দ্বৈততার কারণ ফোটনের মৌলিক ভৌত ধর্মের মধ্যে নিহিত। ফোটন একটি ভরহীন, স্পিন-১ কণা। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির নিয়ম অনুযায়ী, একটি ভরযুক্ত স্পিন-১ কণার তাত্ত্বিকভাবে তিনটি সম্ভাব্য স্পিন-প্রক্ষেপণ অবস্থা থাকা উচিত (m = −1, 0, +1)। কিন্তু ফোটন যেহেতু ভরহীন এবং সর্বদা আলোর গতিতে চলে, তাই এর "অনুদৈর্ঘ্য" (longitudinal, m=0) মেরুকরণ অবস্থাটি ভৌতভাবে অপ্রকাশিত থেকে যায় — গেজ ইনভ্যারিয়েন্সের নীতির কারণে এই অবস্থা কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য ভৌত প্রভাব তৈরি করে না। ফলে বাস্তবে টিকে থাকে কেবল দুটি প্রস্থচ্ছেদীয় (transverse) মেরুকরণ অবস্থা — যা বাম-হাতি ও ডান-হাতি বৃত্তাকার পোলারাইজেশন হিসেবে, অথবা সমতুল্যভাবে দুটি পরস্পর-লম্ব রৈখিক পোলারাইজেশন হিসেবে প্রকাশ পায় (Feynman et al., 1965)। এই বাইনারি কাঠামো এতটাই মৌলিক যে আধুনিক প্রযুক্তিতে (পোলারাইজড সানগ্লাস থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি পর্যন্ত) এটি সরাসরি ব্যবহারযোগ্য একটি প্রায়োগিক দ্বৈত-ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — এই দ্বৈততা ফোটনের স্ব-প্রতিসমতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং উভয়ই একই সাথে সত্য — ফোটন নিজে নিজের প্রতিকণা, অথচ প্রতিটি ফোটনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা-জগৎ একটি অনতিক্রম্য বাইনারি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

পেয়ার অ্যানাইহিলেশন প্রতিসাম্য: উৎপাদনের কাঠামোগত দ্বৈততা
দ্বিতীয় স্তরের দ্বৈততা পাওয়া যায় ফোটন উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক কোয়ান্টাম-ইলেকট্রোডায়নামিক প্রক্রিয়ায় — ইলেকট্রন-পজিট্রন অ্যানাইহিলেশন। যখন একটি ইলেকট্রন ও একটি পজিট্রন (পরস্পর প্রতিকণা) মুখোমুখি সংঘর্ষে মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন এই শক্তি ফোটনের আকারে নির্গত হয়। এখানে একটি কঠোর ভৌত সীমাবদ্ধতা কাজ করে — ভরবেগ সংরক্ষণ সূত্র।
ভর-কেন্দ্র প্রসঙ্গ কাঠামোতে (center-of-momentum frame), সংঘর্ষের পূর্বে ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড়ার নিট ভরবেগ শূন্য। যেহেতু ভরবেগ সংরক্ষিত থাকতে হবে, তাই সংঘর্ষ-পরবর্তী ফোটনগুলোরও নিট ভরবেগ শূন্য হতে হবে। একটিমাত্র ফোটন দিয়ে এটি অর্জন করা ভৌতভাবে অসম্ভব, কারণ একটি একক ফোটনের নিজস্ব একটি অ-শূন্য ভরবেগ থাকবেই (E = pc সম্পর্ক অনুযায়ী) — একটিমাত্র ফোটন নির্গত হলে সমগ্র সিস্টেমটি একটি নিট দিকে ভরবেগ বহন করবে, যা সংরক্ষণ সূত্র লঙ্ঘন করে। তাই ন্যূনতম দুটি ফোটন প্রয়োজন, যেগুলো পরস্পর বিপরীত দিকে (প্রায় ১৮০ ডিগ্রি কোণে) নির্গত হয়ে একে অপরের ভরবেগকে বাতিল করে দেয়। প্রতিটি ফোটন ঠিক ৫১১ কেভি শক্তি বহন করে — যা ইলেকট্রনের (এবং পজিট্রনের) স্থির-ভর শক্তির (mₑc²) সমতুল্য। এই ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে PET স্ক্যান (Positron Emission Tomography) প্রযুক্তির মৌলিক ভিত্তি, যেখানে ঠিক এই দুই বিপরীতমুখী ৫১১ কেভি ফোটনের একযোগে শনাক্তকরণের মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরীণ চিত্র নির্মিত হয়। অবশ্য "প্রতিটি ফোটন ঠিক ৫১১ keV শক্তি বহন করে" — এটি শুধুমাত্র তখনই সত্য, যখন ইলেকট্রন ও পজিট্রন center-of-momentum frame-এ প্রায় স্থির (at rest) অবস্থায় অ্যানাইহিলেট করে। যদি তাদের গতিশক্তি থাকে, তবে উৎপন্ন ফোটনের শক্তি ৫১১ keV-এর বেশি হতে পারে, যদিও শক্তি ও ভরবেগ সংরক্ষণ অবশ্যই বজায় থাকে।
অর্থাৎ, ফোটন নিজে স্ব-প্রতিসম হওয়া সত্ত্বেও, পদার্থ-প্রতিপদার্থ বিলুপ্তির গভীরতম কাঠামোগত নিয়মেই ফোটনের "জোড়ায় জোড়ায়" আবির্ভাবের একটি প্রায় সর্বজনীন প্রবণতা প্রোথিত রয়েছে — এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং ভরবেগ সংরক্ষণের মতো একটি মৌলিক ভৌত সূত্রের প্রত্যক্ষ ফলাফল।
অতিরিক্ত সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বৈত-কাঠামো
উপরের দুটি ফোটন-নির্দিষ্ট দৃষ্টান্তের বাইরেও পদার্থবিজ্ঞানে আরও কয়েকটি স্বতন্ত্র, সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বৈততা রয়েছে, যেগুলো একত্রে বিবেচনা করলে দ্বৈততার প্যাটার্নটি আরও ব্যাপক ও দৃঢ় প্রতীয়মান হয়।

চৌম্বক মেরুর অবিচ্ছেদ্যতা — ডিরাক ১৯৩১ সালে একক চৌম্বক মেরুর তাত্ত্বিক সম্ভাবনা প্রস্তাব করেন (Dirac, 1931), কিন্তু এক শতাব্দীরও বেশি অনুসন্ধানে তা অধরাই রয়ে গেছে (MoEDAL Collaboration, 2018)। কোয়ান্টাম স্পিন — স্টার্ন-গারলাখ পরীক্ষায় (Stern & Gerlach, 1922) প্রথম প্রদর্শিত বাইনারি প্রকৃতি। আধান সংরক্ষণ — নোয়েথারের উপপাদ্য অনুযায়ী গেজ প্রতিসাম্যের সাথে সম্পর্কিত (Noether, 1918)।
পদার্থ-প্রতিপদার্থের এই দ্বৈততা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার তেরোশো বছরেরও পরে আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ৩৬:৩৬ আয়াতের "যা তোমরা জানো না" (وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ) বাক্যাংশের সাথে সংগতিপূর্ণ পাঠ তৈরি করে। এই আলোচনার উদ্দেশ্য এই দাবি করা নয় যে কুরআন নিউট্রন, ফোটন বা কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি পূর্বাভাস দিয়েছে — বরং উদ্দেশ্য এটাই যে কুরআনের ব্যবহৃত ব্যাপক زوج ধারণা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
سُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡأَزۡوَٰجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنۢبِتُ ٱلۡأَرۡضُ وَمِنۡ أَنفُسِهِمۡ وَمِمَّا لَا يَعۡلَمُونَ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি উদ্ভিদ, মানুষ এবং এরা যাদেরকে জানে না তাদের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেছেন জোড়া জোড়া করে। |
৭.৩ অণুজীববিজ্ঞান : ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস
ব্যাকটেরিয়ার প্রধান প্রজনন পদ্ধতি দ্বি-বিভাজন (binary fission), যা সম্পূর্ণ অযৌন — তবে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে conjugation নামে জিন-বিনিময় প্রক্রিয়াও বিদ্যমান, যেখানে F+ ("দাতা") কোষ একটি sex pilus গঠন করে F− ("গ্রহীতা") কোষের সাথে সংযুক্ত হয়ে জেনেটিক উপাদান স্থানান্তর করে। মাইক্রোবায়োলজির পাঠ্যপুস্তকে এই দাতা-গ্রহীতাকে আক্ষরিকভাবে "male"/"female" বা "bacterial mating" বলা হয় (Madigan et al., 2021)।
তবে নির্মোহভাবে বলতে হবে — এটি প্রকৃত যৌন জনন নয়, কারণ গ্যামেট-মিলন ঘটে না এবং নতুন জীবের জন্ম হয় না। প্রকৃত পার্থক্যটি F-plasmid থাকা বা না-থাকা। তাই এখানে প্রাসঙ্গিক জোড়া হলো দাতা-গ্রহীতার ভূমিকা-দ্বৈততা এবং দ্বি-বিভাজন বনাম জিন-বিনিময়ের কৌশল-দ্বৈততা — যা روج শব্দের "প্রকার" অর্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
জীবকোষের বাইরে সম্পূর্ণ জড় বস্তুর মতো আচরণ করা ভাইরাসের নিজস্ব কোনো লিঙ্গ বা প্রত্যক্ষ প্রজনন অঙ্গ না থাকলেও, ব্যাকটেরিয়ার জিন-বিনিময়ের মতো তাদের জগতেও চমৎকার কৌশল ও ভূমিকা-দ্বৈততা বিদ্যমান। ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রথম কৌশলগত দ্বৈততা দেখা যায় ব্যাকটেরিওফাজের আক্রমণাত্মক লাইটিক (Lytic) এবং সুপ্ত লাইসোজেনিক (Lysogenic) জীবনচক্রের বৈপরীত্যে, যেখানে পরিবেশভেদে ভাইরাস সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি কৌশল বেছে নেয়। অপরদিকে, ভাইরাসের নিজস্ব উৎপত্তি ও নতুন রূপ ধারণের জন্য ব্যাকটেরিয়াল কনজুগেশনের সমতুল্য জিন-বিনিময় ঘটে মূলত দুইভাবে—একাধিক ভাইরাসের জিনোমের মধ্যকার অংশবিশেষের সরাসরি অদলবদল বা রিকম্বিনেশন (Recombination) এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো খণ্ডিত জিনোমধারী ভাইরাসের ক্ষেত্রে জিনের খণ্ডগুলোর এলোমেলো মিশ্রণ বা রিসর্টমেন্ট (Reassortment)। শুধু তাই নয়, ভাইরাসের এই ভূমিকা-দ্বৈততা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তারা নিজেরা জিন পরিবর্তনের পাশাপাশি ট্রান্সডাকশন (Transduction) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ বহন করে অন্য ব্যাকটেরিয়ায় স্থানান্তরের বাহক বা "দাতা" হিসেবে কাজ করে; ফলে ভাইরাসের কোনো প্রত্যক্ষ 'যৌন মিলন' বা গ্যামেট সৃষ্টি না হলেও, তাদের এই বহুমাত্রিক জিনগত কৌশলগুলো প্রকৃতির এক সুনির্দিষ্ট ও সুগভীর দ্বৈততার নিয়মকেই নির্দেশ করে।

সবচেয়ে গভীর স্তরে, প্রতিটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা কোষের বংশগতির ভিত্তি — DNA-এর দ্বি-হেলিক্স গঠন — একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক নিয়মের কারণে পরিপূরক ক্ষারক-জোড়ার ওপর নির্মিত। এই জোড়া-গঠন কোনো নির্বিচার প্যাটার্ন নয়; এটি হাইড্রোজেন বন্ধনের জ্যামিতিক ও রাসায়নিক সীমাবদ্ধতার একটি প্রত্যক্ষ ফলাফল — অ্যাডেনিন সবসময় থাইমিনের সাথে দুটি হাইড্রোজেন বন্ধনে যুক্ত হয়, আর গুয়ানিন সবসময় সাইটোসিনের সাথে তিনটি হাইড্রোজেন বন্ধনে যুক্ত হয়, কারণ এই নির্দিষ্ট জোড়াগুলোরই আণবিক আকৃতি ও বন্ধন-বিন্দুর সংখ্যা একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে খাপ খায় (Watson & Crick, 1953)। অন্য যেকোনো সংমিশ্রণ (যেমন অ্যাডেনিন-গুয়ানিন) জ্যামিতিকভাবে ফিট হয় না। এটি দ্বিতীয় শ্রেণির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ — এখানে দ্বৈততা কোনো পর্যবেক্ষণ-নির্ভর কাকতালীয় মিল নয়, বরং একটি রাসায়নিক সূত্র থেকে সরাসরি অনুমেয়।

অ্যামিবা ও কিছু প্রোটোজোয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি লক্ষণীয় প্যাটার্ন আছে — কিছু গোষ্ঠীতে (যেমন সামাজিক অ্যামিবা Dictyostelium discoideum) দুইয়ের অধিক "মেটিং টাইপ" পাওয়া যায়, যেখানে যেকোনো দুটি ভিন্ন টাইপ একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারে কিন্তু নিজের টাইপের সাথে নয়। এই পর্যবেক্ষণটি পরবর্তী অংশে ছত্রাকের প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই একই অন্তর্নিহিত নীতি কাজ করে।
৭.৪ উদ্ভিদবিজ্ঞান: ফল, ফুল ও পরাগায়ন
তাফসীরে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ১৩:৩ আয়াতে زَوْجَيْنِ অর্থ "দুই প্রকার" বলেছেন — টক-মিষ্টি, তাজা-শুকনো; ফুলের যৌন জীববিজ্ঞান নয়। এই ব্যাখ্যাই আয়াতের প্রাথমিক বার্তা, এবং এই তাফসিরগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই উদ্ভিদ-প্রজননের বিজ্ঞান স্বতন্ত্রভাবে পরীক্ষাযোগ্য।
স্বপরাগী উদ্ভিদে (সরিষা, ধুতুরা, শিম, টমেটো) একটি ফুলকে "পূর্ণাঙ্গ ফুল" (perfect flower) বলা হয় যদি তাতে কার্যকর পুংকেশর (androecium) ও গর্ভকেশর (gynoecium) উভয়ই উপস্থিত থাকে — এখানে পরাগরেণু নিজের ফুলের গর্ভমুণ্ডেই স্থানান্তরিত হয়, কিন্তু এই প্রক্রিয়াতেও পুরুষ গ্যামেট (পরাগরেণুর মধ্যে) ও স্ত্রী গ্যামেট (ডিম্বকের মধ্যে) সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামোতে উৎপন্ন হয় এবং পৃথকভাবেই মিলিত হয় — অর্থাৎ স্বপরাগায়ন মানে দুই ধরনের গ্যামেটের অনুপস্থিতি নয়, বরং তাদের উৎসস্থল একই দেহে হওয়া।
একগৃহী (monoecious) উদ্ভিদে (ভুট্টা, শসা) একই গাছে সম্পূর্ণ আলাদা পুরুষ ফুল ও স্ত্রী ফুল উৎপন্ন হয় — এই কাঠামোতে পরাগায়নের জন্য বায়ু বা পতঙ্গের মাধ্যমে দুই ফুলের মধ্যে পরাগ স্থানান্তর প্রয়োজন। দ্বিগৃহী (dioecious) উদ্ভিদে (খেজুর) পুরুষ ও স্ত্রী ফুল সম্পূর্ণ আলাদা গাছে জন্মায়, এবং এই বিন্যাসে ফল উৎপাদনের জন্য পুরুষ গাছ থেকে স্ত্রী গাছে পরাগ স্থানান্তর অপরিহার্য — এখানে পুরুষ ও স্ত্রীর পার্থক্য উদ্ভিদের সামগ্রিক স্তরে (কোষ বা ফুলের স্তরে নয়) স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

৭.৬ ছত্রাকবিজ্ঞান: Schizophyllum commune-এর হাজারো মেটিং টাইপ

Schizophyllum commune নামক একটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছত্রাক প্রজাতিতে বিজ্ঞানীরা ২৩,৩২৮টি সম্ভাব্য মেটিং টাইপ গণনা করেছেন। এই সংখ্যাটি কীভাবে আসে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ — এই ছত্রাকে দুটি স্বতন্ত্র জিন-লোকাস (A ও B) রয়েছে, এবং প্রতিটি লোকাস আবার একাধিক উপ-লোকাস ও বহু অ্যালিল (রূপভেদ) নিয়ে গঠিত — A লোকাসে আনুমানিক ২৮৮টি ও B লোকাসে আনুমানিক ৮১টি অ্যালিল সমন্বয় করে এই বিশাল সংখ্যাটি তৈরি হয় (Kothe, 1996)। এই বিশাল বৈচিত্র্য প্রথম দর্শনে "জোড়া" ধারণার সরাসরি বিরোধী মনে হতে পারে, কারণ "হাজারো লিঙ্গ" শোনালে দ্বি-আদর্শ (binary) কাঠামোর ধারণা ভেঙে যাওয়ার মতো মনে হয়।
কিন্তু এই বৈচিত্র্যের পেছনের প্রকৃত মিলন-প্রক্রিয়াটি ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উদ্ভাসিত হয়। মিলনের জৈবিক শর্তটি হলো — দুটি ছত্রাকের সফল মিলনের জন্য A ও B, এই উভয় লোকাসেই একে অপরের থেকে ভিন্ন অ্যালিল থাকতে হবে (নিজের অ্যালিলের সাথে মিলন সম্ভব নয়)। অর্থাৎ, ২৩,৩২৮ সংখ্যাটি মূলত একটি "দুই-ফ্যাক্টর সামঞ্জস্য পরীক্ষা" (two-factor compatibility test)-এর সম্ভাব্য ফলাফল বর্ণনা করে, একটি "হাজারো লিঙ্গের" জৈবিক বাস্তবতা নয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — বৈচিত্র্যের এই বিশাল সংখ্যা সত্ত্বেও, প্রতিটি প্রকৃত মিলন-ঘটনায় সবসময় ঠিক দুটি নিউক্লিয়াসের মিলন ঘটে (একটি প্রক্রিয়া যাকে বলা হয় dikaryon গঠন) — কখনো একসাথে তিন বা চারটি নিউক্লিয়াস মেশে না, নির্বিশেষে কতগুলো সম্ভাব্য সঙ্গী উপলব্ধ ছিল তার ওপর। সুতরাং ছত্রাকের “হাজারো মেটিং টাইপ” আসলে জোড়ার সংখ্যা নয়, বরং জোড়া-গঠনের সম্ভাব্য সমন্বয়ের সংখ্যা — মূল দ্বৈত-মিলন কাঠামো অক্ষতই থেকে যায়।
আন্দালুসিয়ান ফকিহ ও মুফাসসির ইবনে আতিয়্যাহ (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসির আল-মুহাররার আল-ওয়াজিজ-এ زوج (জাওজ) শব্দের লুগাতী ও বালাগাতী ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, আরবি ভাষায় زوج বলতে কেবল আক্ষরিক একটি পুরুষ বা একটি স্ত্রী-র একক সংখ্যাবাচক জোড়া বোঝায় না; বরং এর দ্বারা মূলত صنف (প্রকার, শ্রেণি বা লিঙ্গীয় গোষ্ঠী)-কে নির্দেশ করা হয়। তাঁর মতে, কোনো সামষ্টিক প্রসঙ্গে যখন এই শব্দ ব্যবহৃত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য থাকে সৃষ্টির বৈচিত্র্যময় "শ্রেণিবিন্যাস" বা "প্রকারভেদ" (Diversification of kinds) ফুটিয়ে তোলা, যা গাণিতিক সংখ্যা '২' এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতার কারণেই Schizophyllum commune ছত্রাকের ক্ষেত্রে ২৩,০০০-এর বেশি মেটিং "টাইপ" বা প্রকারভেদ থাকা সত্ত্বেও তা কুরআনিক পরিভাষার পরিপন্থী নয়; কারণ এই হাজারো প্রকারের প্রতিটিই মূলত প্রজননগতভাবে একেকটি স্বতন্ত্র শ্রেণি বা গোষ্ঠী (أصناف) প্রকাশ করে, যার চূড়ান্ত ভৌত রূপায়নটি ঘটে দ্বিপাক্ষিক (Pairwise) মিলনের মাধ্যমে।

শৈবাল ও বহু ছত্রাকে সত্যিকার অর্থেই অযৌন ও যৌন—উভয় ধরনের জনন প্রক্রিয়া বিদ্যমান। অযৌন জননে এরা খণ্ডায়ন, বিভাজন, মুকুলোদগম বা স্পোর গঠনের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে; আবার যৌন জননে পরস্পর-সামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি mating type (যেমন ‘+’ ও ‘−’) বা দুটি গ্যামেট/নিউক্লিয়াসের প্রকৃত সংযোজনের মাধ্যমে জিনগত পুনর্গঠন ঘটে এবং নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একই জীবগোষ্ঠীর মধ্যেই অযৌন ও যৌন—এই দুটি স্বতন্ত্র ও পরিপূরক প্রজনন কৌশল সহাবস্থান করে, যা একটি সুস্পষ্ট জৈবিক দ্বৈততা নির্দেশ করে।
৭.৬ প্রাণিজগৎ: উভলিঙ্গ প্রাণী
ইসলামি ফিকহে الخنثى (খুনসা/হিজড়া)-এর ক্ষেত্রে যদি নারী বা পুরুষের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য প্রাধান্য পায়, তবে তাকে সেই প্রাধান্যশীল লিঙ্গের বিধান দেওয়া হয়; আর উত্তরাধিকার (মীরাস) বণ্টানেও এ নীতিই অনুসৃত হয়েছে।(ইবনে কুদামা, আল-মুগনী; কাসানী, বাদায়িউস সানায়ি) — যা এই আলোচনার ধর্মতাত্ত্বিক সমান্তরাল, জৈববৈজ্ঞানিক দাবি নয়।

স্পঞ্জের বহু প্রজাতি এবং বহু শামুক ও সি-হেয়ার (Aplysia) প্রজাতি simultaneous hermaphrodite; অর্থাৎ একই দেহে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় জনন-তন্ত্র থাকে।" দেহে একসাথে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় জনন-তন্ত্র বিদ্যমান — এই জীবগুলোতে পৃথক পুরুষ ও স্ত্রী ব্যক্তির অনুপস্থিতিকে "জোড়া" নীতির ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এই ধারণাটি পরীক্ষা করলে দেখা যায় দ্বৈততা এখানেও অনুপস্থিত নয়, বরং তার বিন্যাস ভিন্ন — একই দেহের ভেতরেই দুই ধরনের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জনন-তন্ত্রের সহাবস্থান নিজেই একটি গঠনগত জোড়া, এবং স্ব-নিষেকের ক্ষেত্রেও পুরুষ গ্যামেট (শুক্রাণু) ও স্ত্রী গ্যামেট (ডিম্বাণু) সম্পূর্ণ পৃথক কোষীয় প্রক্রিয়ায় (স্পার্মাটোজেনেসিস ও ওজেনেসিস) উৎপন্ন হয় এবং নিষেকের চূড়ান্ত মুহূর্তেই মিলিত হয়।
সি-হেয়ার এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ প্রকৃতিতে এই প্রজাতি বিখ্যাতভাবে "মেটিং চেইন" গঠন করে — একাধিক ব্যক্তি একসাথে একটি শৃঙ্খল আকারে যুক্ত হয়, যেখানে প্রতিটি একক ব্যক্তি একই সাথে দুটি ভূমিকা পালন করে: তার সামনের সঙ্গীর প্রতি পুরুষ-ভূমিকা (শুক্রাণু প্রদান) এবং পেছনের সঙ্গীর প্রতি স্ত্রী-ভূমিকা (ডিম্বাণু গ্রহণ)। এই ব্যবস্থাটি লক্ষণীয় — সামগ্রিক শৃঙ্খলটি যত বড়ই হোক না কেন (কখনো কখনো ডজনখানেক ব্যক্তি পর্যন্ত), প্রতিটি একক সংযোগ-বিন্দুতে ঠিক দুটি ভূমিকা কার্যকর থাকে — একটি দাতা, একটি গ্রহীতা। গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্ম (Chaetognatha)-এ শারীরবৃত্তীয়ভাবে দেহের সামনের ও পেছনের অংশে সুস্পষ্টভাবে পৃথক পুরুষ ও স্ত্রী জনন-অঙ্গ বিদ্যমান, এবং যদিও এই প্রজাতি স্ব-নিষেক সক্ষম, অধিকাংশ প্রজাতি প্রকৃতিতে ক্রস-ফার্টিলাইজেশনকেই প্রাধান্য দেয়।
৭.৭ প্রাণিজগৎ: পার্থেনোজেনেসিস ও হাইব্রিড উৎপত্তি
নিউ মেক্সিকো হুইপটেইল (Aspidoscelis neomexicanus) একটি সম্পূর্ণ স্ত্রীলিঙ্গের প্রজাতি, যা পার্থেনোজেনেসিসের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে—এখানে কোনো নিষেক ছাড়াই একটি ডিম্বাণু থেকে সরাসরি একটি সম্পূর্ণ ভ্রূণ বিকশিত হয়। এটি প্রায়ই "পুরুষবিহীন প্রজাতি"-র একটি চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যেন এই প্রজাতির অস্তিত্বে জোড়া-নীতির কোনো ভূমিকাই নেই। এখানে একটি পদ্ধতিগত বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এই অংশে উদ্ধৃত জীববৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো তাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আলোকে উপস্থাপিত হয়েছে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট প্রজাতির সামগ্রিক উৎপত্তিগতভাবে ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নিষ্পত্তি করা নয়; বরং বর্তমান বৈজ্ঞানিক সাহিত্য Aspidoscelis neomexicanus-এর উৎপত্তি সম্পর্কে কী দাবি করে এবং সেই দাবি আলোচ্য আপত্তির মূল্যায়নে কীভাবে প্রাসঙ্গিক—সেটি পরীক্ষা করা।
কিন্তু এই প্রজাতির উৎপত্তির গভীর তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উন্মোচন করে। হো ও সহকর্মীদের ২০২৫ সালের ক্রোমোজোম-স্তরের জিনোম অ্যাসেম্বলি গবেষণাসহ একাধিক পূর্ববর্তী গবেষণা (Cole et al., 1988; Persons et al., 2021; Ho et al., 2025) নিশ্চিত করেছে যে এই প্রজাতিটি দুটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, যৌন-প্রজননকারী প্রজাতির আন্তঃপ্রজাতি সংকরায়নের একটি সরাসরি ফল—মাতৃ-প্রজাতি Aspidoscelis tigris marmorata এবং পিতৃ-প্রজাতি Aspidoscelis inornata। এই দুই ভিন্ন প্রজাতির একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রীর প্রকৃত যৌন মিলনের মাধ্যমে যে সংকর (hybrid) সন্তানের জন্ম হয়, তার মধ্যেই পরবর্তীকালে পার্থেনোজেনেটিক বংশবিস্তারের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই সংকর জিনোমই প্রজন্মান্তরে ক্লোনালভাবে সংরক্ষিত হতে থাকে।
অর্থাৎ, যে প্রজাতিকে "পুরুষবিহীন" হিসেবে দেখা হয়, তার অস্তিত্বের একেবারে মূলেই—উৎপত্তির মুহূর্তেই—রয়েছে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রীর প্রকৃত জোড়া। উৎপত্তিগতভাবে এটি জোড়া-নীতির ব্যতিক্রম নয়, বরং জোড়ার একটি প্রত্যক্ষ, প্রামাণ্য ফলাফল। এই প্রজাতির প্রতিটি ব্যক্তির জিনোমে উভয় পূর্বপুরুষ প্রজাতির জিনগত অবদান স্থায়ী হেটেরোজাইগোসিটি (heterozygosity) হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে, যা তাদের সংকর উৎপত্তির জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।

Aspidoscelis গণের একাধিক একলিঙ্গ প্রজাতিও একই উৎপত্তিয় ধারা অনুসরণ করে—প্রতিটিই দুটি ভিন্ন যৌন-প্রজননকারী পিতৃ-মাতৃ প্রজাতির সংকরায়নের ফল। যেসব জনসংখ্যায় কেবল স্ত্রী সদস্য বিদ্যমান, সেখানেও একটি উল্লেখযোগ্য আচরণগত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। "ভেন্ট্রাল মাউন্ট পজিশন" (ventral mount position)-এ একটি স্ত্রী টিকটিকি হরমোনগত পরিবর্তনের ফলে সাময়িকভাবে পুরুষসুলভ সঙ্গম-আচরণ প্রদর্শন করে, আর অপরটি স্ত্রী-ভূমিকা পালন করে। যদিও এই আচরণে প্রকৃত নিষেক ঘটে না, তবুও এটি ডিম্বস্ফোটন ও ডিম উৎপাদনকে হরমোনগতভাবে উদ্দীপিত করে এবং প্রজনন সাফল্য বৃদ্ধি করে।
আরও গভীর আণবিক স্তরে দেখা যায়, পার্থেনোজেনেসিস মানেই ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং প্রতিটি নতুন ভ্রূণে পূর্ণ ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম-সমষ্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। নিউ মেক্সিকো হুইপটেইলের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ automixis-এর মাধ্যমে নয়; বরং মিয়োসিসের পূর্বেই জিনোমের পূর্ব-প্রতিলিপিকরণ (premeiotic genome duplication বা endomitosis)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, ফলে পরবর্তী মিয়োসিসের পরও ভ্রূণ ডিপ্লয়েড অবস্থাই বজায় রাখে। অন্যদিকে, বহু পার্থেনোজেনেটিক প্রাণীতে এই একই লক্ষ্য automixis-এর মাধ্যমে—যেমন পোলার বডির সাথে নিউক্লিয়াসের সংযোজন বা অন্যান্য ক্রোমোজোম-পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়ার সাহায্যে—অর্জিত হয়। অর্থাৎ, পিতার অনুপস্থিতিতেও পূর্ণাঙ্গ জীব গঠনের জন্য দ্বিগুণ ক্রোমোজোম-সমষ্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রকৃতির এক অপরিহার্য জৈবিক শর্ত; কেবল সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন জীবে ভিন্ন হতে পারে।
"বর্তমান প্রজন্মে পুরুষের অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রজনন ঘটে; তবে অধিকাংশ obligate parthenogenetic vertebrate lineage-এর বর্তমান জীববৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী উৎপত্তি পূর্ববর্তী যৌন সংকরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এখানে বর্তমান প্রজনন ও বর্তমান জীববৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী উৎপত্তি—দুটি পৃথক স্তর আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।"
পার্থেনোজেনেসিস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; কোমোডো ড্রাগন, টার্কি, কিছু হাঙর প্রজাতি এবং পতঙ্গের একাধিক বর্গে (বিশেষত মেফ্লাই, ফড়িং ও লাঠি-পোকা) facultative parthenogenesis দেখা যায়—অর্থাৎ, এরা সাধারণ অবস্থায় যৌন প্রজননে সক্ষম হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে অযৌনভাবেও বংশবিস্তার করতে পারে। কোমোডো ড্রাগনের লিঙ্গ-নির্ধারণ ব্যবস্থা ZW ধরনের। পুরুষ ছাড়া পার্থেনোজেনেসিসের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তানের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু থেকে সম্ভাব্য দুটি ক্রোমোজোম-সমন্বয় (ZZ ও WW) সৃষ্টি হতে পারে; কিন্তু WW ভ্রূণ টিকে থাকে না, কেবল ZZ ভ্রূণই জীবিত থাকে। ফলে তথাকথিত "কুমারী জন্ম" থেকে কেবল পুরুষ সন্তানই জন্মায়। অর্থাৎ প্রকৃতি যখন সাময়িকভাবে যৌন-প্রজননের স্বাভাবিক জোড়া-ব্যবস্থার বাইরে যায়, তখনও এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যা অনুপস্থিত লিঙ্গকে পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জনসংখ্যাকে পুনরায় স্বাভাবিক যৌন প্রজননের উপযোগী করে তোলে।
আরও গভীর আণবিক স্তরে দেখা যায়, পার্থেনোজেনেসিস মানেই ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং প্রতিটি নতুন ভ্রূণে পূর্ণ ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম-সমষ্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। বহু পার্থেনোজেনেটিক প্রাণীতে এই লক্ষ্য automixis-এর মাধ্যমে অর্জিত হয়—যেমন ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে পোলার বডির সংযোজন বা অন্যান্য ক্রোমোজোম-পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আবার অন্য কিছু প্রজাতিতে, যেমন নিউ মেক্সিকো হুইপটেইল টিকটিকিতে, ডিপ্লয়েডি বজায় থাকে premeiotic genome duplication (endomitosis)-এর মাধ্যমে, যেখানে মিয়োসিসের আগেই জিনোম দ্বিগুণ হয়ে যায়। অর্থাৎ পিতা অনুপস্থিত হলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ জীব গঠনের জন্য দ্বিগুণ ক্রোমোজোম-সমষ্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রকৃতির এক অপরিহার্য জৈবিক শর্ত; কেবল সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি বিভিন্ন জীবে ভিন্ন হতে পারে।

৭.৮ জীববিজ্ঞানে "জোড়া" ধারণার বহুমাত্রিকতা: আপাত ব্যতিক্রমগুলোর বিশ্লেষণ
সংশ্লেষণী সারণী:
উপরের আলোচিত জীববৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্তগুলো এতটাই বিচিত্র প্রকৃতির যে একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক সারণী পাঠকের জন্য সামগ্রিক প্যাটার্নটি এক নজরে অনুধাবন করা সহজ করে দিতে পারে। এই সারণীর উদ্দেশ্য কোনো নতুন দাবি প্রতিষ্ঠা নয়, বরং পূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত প্রমাণগুলোকে সংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত সতর্কতা প্রয়োজন এখানে — "দ্বৈততা আছে কিনা" এই প্রশ্নের উত্তর নিছক হ্যাঁ/না আকারে দেওয়া বিভ্রান্তিকর, কারণ তা কোন স্তরে (মিলন-প্রক্রিয়া, উৎপত্তি, নাকি আণবিক গঠন) দ্বৈততা বিদ্যমান তা আড়াল করে ফেলে। তাই নিচের সারণীতে প্রতিটি দৃষ্টান্তের জন্য কোন স্তরে দ্বৈততা প্রযোজ্য এবং কোন শ্রেণির (§২ অনুযায়ী) তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
জীববৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্তের সারসংক্ষেপ:
জীব/প্রক্রিয়া | দ্বৈততার প্রকৃত অবস্থান | শ্রেণি |
|---|---|---|
মানুষ ও অধিকাংশ প্রাণী | সরাসরি, প্রতি মিলন-ঘটনায় | ১ |
কেঁচো, শামুক (উভলিঙ্গ) | দুই ব্যক্তির পারস্পরিক গ্যামেট-বিনিময় | ১ |
Basidiomycete ছত্রাক | প্রতিটি মিলনে ঠিক দুই ভিন্ন টাইপ আবশ্যক | ১ |
ব্যাকটেরিয়া (Conjugation) | কার্যকরী দাতা-গ্রহীতা ভূমিকা-দ্বৈততা | ১ |
Whiptail টিকটিকি | উৎপত্তিতে পুরুষ-স্ত্রী হাইব্রিডাইজেশন, বর্তমান প্রজন্মে অনুপস্থিত | ১ (উৎপত্তিগত) |
Hydra (Budding) | প্রত্যক্ষ মিলন-দ্বৈততা অনুপস্থিত; বিকল্পভাবে যৌন প্রজননে সক্ষম | প্রযোজ্য নয় (স্বীকৃত ব্যতিক্রম) |
Amoeba (Binary fission) | প্রত্যক্ষ মিলন-দ্বৈততা অনুপস্থিত | প্রযোজ্য নয় (স্বীকৃত ব্যতিক্রম) |
এই সারণী থেকে তিনটি সিদ্ধান্ত: প্রথমত, অধিকাংশ আপাত ব্যতিক্রম ঘনিষ্ঠ পরীক্ষায় দ্বৈততার নীতির সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ প্রমাণিত হয়, যদিও দ্বৈততার অবস্থান ভিন্ন (মিলন-প্রক্রিয়া বনাম ঐতিহাসিক উৎপত্তি)। দ্বিতীয়ত, Hydra ও Amoeba-র মতো প্রকৃত অযৌন প্রক্রিয়াকে জোরপূর্বক দ্বৈততার কাঠামোয় ফিট করানো হয়নি — এগুলো সৎভাবে স্বীকৃত ব্যতিক্রম। তৃতীয়ত, একটি সৎভাবে স্বীকৃত ব্যতিক্রমের অস্তিত্ব একটি ব্যাপক ভাষাতাত্ত্বিক দাবিকে খণ্ডন করে না, যদি সেই দাবি একটি প্রধান প্রবণতা বর্ণনা করে — ঠিক যেমন ইবনে আতিয়্যাহর "ন্যূনতম দুই" নীতি ও ২৭:২৩ আয়াতের দৃষ্টান্ত ভাষাতাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
৮. মেটাফিজিক্যাল প্রসঙ্গ: স্বতন্ত্র অনুচ্ছেদ
তাফসিরে ইমাম রাযীর তাফসীরে কবীর-এ একটি লক্ষণীয় বিবরণ পাওয়া যায় — ইবনে জুরাইজের সূত্রে বর্ণিত: "ফেরেশতারা এক শ্রেণি, মানুষ এক শ্রেণি, জিন এক শ্রেণি, পৃথিবীর উদ্ভিদ এক শ্রেণি, প্রতিটি প্রজাতির পাখিও এক শ্রেণি।" এখানে "যুগল/শ্রেণি" أزواج শব্দের দ্বিতীয় অর্থে (প্রকার/শ্রেণি) ব্যবহৃত — অর্থাৎ ফেরেশতা, মানুষ ও জিন প্রত্যেকেই একটি পৃথক, স্বতন্ত্র "প্রকার" হিসেবে شيء-এর সাধারণ শ্রেণিবিন্যাসের অধীনে গণ্য, নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক লিঙ্গ-জোড়া গঠন করার অর্থে নয়।
এই তৃতীয় শ্রেণির বিষয়গুলো — আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ব সংক্রান্ত প্রশ্ন — পরীক্ষাগারে যাচাইযোগ্য নয়, এবং এদের আলোচনা সম্পূর্ণরূপে টেক্সট-আভ্যন্তরীণ ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ সংক্রান্ত প্রশ্নে, আয়াতের ক্রিয়াপদটিই (خَلَقْنَا — "আমি সৃষ্টি করেছি") একটি স্পষ্ট সমাধান প্রদান করে — আলোচ্য বিষয় হলো সৃষ্ট বস্তু (মাখলুক), স্রষ্টা (খালিক) নয়; আয়াতগুলো কখনোই আল্লাহকে "সৃষ্ট"-দের তালিকাভুক্ত করেনি। সূরা আল-ইখলাস (১১২:৩-৪)-এ এটি সরাসরি স্পষ্ট করা হয়েছে — "তিনি জন্ম দেননি, তাঁকে জন্ম দেওয়া হয়নি, এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।" ইমাম রাযী নিজেও ৫১:৪৯ আয়াতের ব্যাখ্যায় এই যুক্তিসূত্র ব্যবহার করেছেন — "যুগলসমূহের স্রষ্টার নিজের কোনো যুগল থাকতে পারে না, কারণ থাকলে তিনিও সম্ভাব্য অস্তিত্বসম্পন্ন হতেন, তখন তিনি সৃষ্ট হতেন, স্রষ্টা নন।"
জান্নাত-জাহান্নাম প্রসঙ্গে কোনো পৃথক জটিলতা নেই, কারণ ইবনে কাসীরের তাফসির অনুযায়ী এরা নিজেরাই ইতিমধ্যেই পরস্পরের যুগল হিসেবে সরাসরি তালিকাভুক্ত — একটি বিপরীত গন্তব্য জোড়া, পুরস্কার বনাম শাস্তি।
এই অংশের প্রতিটি দাবি শাক্ষ্য ও বিশ্বাস-ভিত্তিক (তৃতীয় শ্রেণি), অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞান নয় বরং ওহীর শাক্ষ্যের যৌত্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি ।
৯. তুলনামূলক দর্শন: ঐতিহাসিক অগ্রাধিকার প্রশ্ন
প্রাচীন চীনা তাওবাদী দর্শনে ইন-ইয়াং ধারণা (খ্রিস্টপূর্ব অন্তত পঞ্চম শতাব্দী থেকে প্রচলিত) "সবকিছু পরস্পর-নির্ভরশীল বিপরীত জোড়ায় গঠিত" — এই দার্শনিক নীতি কুরআনের বহু আগে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ঐতিহাসিক তথ্য কখনো কখনো এই সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে যে কুরআনের ভাষ্য কোনো অনন্য বা মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি নয়।
এই যুক্তিতে দুটি ভিন্ন স্তরের বিষয় মিশ্রিত হয়ে যায়, যা পূর্বে প্রতিষ্ঠিত তিন-স্তরীয় কাঠামো ব্যবহার করে পৃথক করা প্রয়োজন। প্রথমত, ইন-ইয়াং মূলত তৃতীয় শ্রেণির — একটি বিমূর্ত, পর্যবেক্ষণ-নির্ভর কসমোলজিক্যাল নীতি, যা পরীক্ষাগারে পরিমাপযোগ্য নয়। বিপরীতে, এই প্রবন্ধের মূল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্তগুলো — পদার্থ-প্রতিপদার্থ, DNA ক্ষারক-জোড়া, ফোটন পোলারাইজেশন, অ্যান্টিনিউট্রন — সম্পূর্ণরূপে দ্বিতীয় শ্রেণির, নির্দিষ্ট পরীক্ষায় পরিমাপযোগ্য ও বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান দ্বারা যাচাইকৃত। প্রাচীন চীনা দার্শনিকরা কখনোই অ্যান্টিম্যাটার, DNA বা সাবঅ্যাটমিক কণার কথা বলেননি — তৃতীয় শ্রেণির একটি প্রাচীন দার্শনিক স্বজ্ঞার অস্তিত্ব থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে দ্বিতীয় শ্রেণির নির্দিষ্ট, পরবর্তীকালীন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাথে সংগতির আলোচনাও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক অগ্রাধিকার ও সত্যতা যুক্তিবিদ্যায় দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রশ্ন — কোনো ধারণা প্রথম কে বলেছিল তা দিয়ে সেই ধারণা সত্য না মিথ্যা নির্ধারিত হয় না, এটিকে বলা হয় genetic fallacy। বরং বিপরীতভাবেও যুক্তি দেওয়া সম্ভব — যদি ভৌগোলিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একাধিক সভ্যতা (প্রাচীন চীন, হেরাক্লিটাসের "বিপরীতের ঐক্য"-সহ প্রাচীন গ্রিস, জরথুস্ত্রীয় দ্বৈতবাদ, সপ্তম শতাব্দীর আরব) স্বাধীনভাবে প্রকৃতিতে ব্যাপক দ্বৈততার একটি সাধারণ প্যাটার্ন লক্ষ্য করে থাকে, তাহলে এই অভিসারী পর্যবেক্ষণ প্যাটার্নটির বাস্তব ভিত্তিকে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করে — কোনো একক সংস্কৃতির উদ্ভাবন নয়, বরং প্রকৃতির একটি প্রকৃত, ব্যাপকভাবে অনুধাবনযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

১০. পদ্ধতিগত আপত্তির জবাবউপরের ভাষাতাত্ত্বিক, তাফসিরগত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে চারটি স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত আপত্তি ওঠে, যেগুলো একে অপরের থেকে পৃথকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। |
১০.১ "বৈজ্ঞানিক মুজিজা" আপত্তি: একটি সাধারণ আপত্তি হলো — এই ধরনের আলোচনা কি আসলে দাবি করছে কুরআন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞান পূর্বাভাস দিয়েছে (i'jaz ilmi)? মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যেই এই প্রশ্নে আভ্যন্তরীণ বিতর্ক বিদ্যমান, এবং বৈজ্ঞানিক ই'জাজ পদ্ধতি ইসলামি পণ্ডিতদের সর্বসম্মত অনুমোদন পায়নি। এই প্রবন্ধ ইচ্ছাকৃতভাবে সেই বলিষ্ঠ দাবি এড়িয়ে বরং "তাফসীর ইলমী"-র বিনীততর ঘরানায় থেকেছে (ইমাম রাযী, মুহাম্মদ আবদুহ, তানতাভী জাওহারীর ধারা) — অর্থাৎ দাবি এই নয় যে "কুরআন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান পূর্বাভাস দিয়েছে", বরং এই যে "কুরআনের বর্ণিত সাধারণ নীতি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে ব্যাপকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ"। §৭.২-এর শেষে এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। |
১০.২ Post-hoc আপত্তি : আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষিতে একটি বহুল প্রচলিত আপত্তি হলো—আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পর কুরআনের আয়াতগুলোর সঙ্গে সেই আবিষ্কারগুলোর সম্ভাব্য সামঞ্জস্য অনুসন্ধান করা নাকি post hoc ব্যাখ্যা; ফলে এটি পদ্ধতিগতভাবে অবৈধ বা বৌদ্ধিকভাবে অসৎ। কিন্তু এই আপত্তিটি নিজেই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় যদি তাদের ধর্মগ্রন্থকে ঐশী বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, তাহলে নতুন জ্ঞান, নতুন আবিষ্কার কিংবা নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে সেই গ্রন্থের ভাষা, শব্দার্থ ও বক্তব্য পুনর্বিবেচনা করা একটি স্বাভাবিক ব্যাখ্যাগত (hermeneutic) প্রক্রিয়া। ইতিহাসে ধর্মীয়, দার্শনিক এমনকি আইনগত গ্রন্থের ক্ষেত্রেও নতুন তথ্যের আলোকে পুনঃব্যাখ্যা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধিক পদ্ধতি। অতএব, কোনো ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পরে প্রস্তাবিত হয়েছে—এই তথ্যটুকু একাই সেই ব্যাখ্যাকে অসৎ, অগ্রহণযোগ্য বা অবৈধ প্রমাণ করে না। প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—ব্যাখ্যাটি ভাষাতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, প্রসঙ্গগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম কি না। দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, মতবাদ বা সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। যে কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব দার্শনিক বা ধর্মীয় কাঠামোর আলোকে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করার অধিকার রাখে। সেই ব্যাখ্যার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার যুক্তির শক্তি, প্রমাণের মান এবং পদ্ধতিগত সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে; ব্যাখ্যাকারীর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। অতএব, কেবল মুসলিম হওয়ার কারণে কোনো গবেষক কুরআনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সম্ভাব্য সামঞ্জস্য অনুসন্ধান করতে পারবেন না—এমন দাবি পদ্ধতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, এই আলোচনায় মূল্যায়নের মানদণ্ড সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করা আবশ্যক। যদি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে কুরআনের সম্ভাব্য সামঞ্জস্য অনুসন্ধানকে শুধুমাত্র post hoc হওয়ার কারণে অগ্রহণযোগ্য বলা হয়, তবে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক বা সহিংস ঘটনাকে কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াতের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতিগত সতর্কতা অনুসরণ করা উচিত। অন্যথায় মূল্যায়নটি সমান মানদণ্ডে পরিচালিত হয় না এবং তা double standard-এর ঝুঁকিতে পড়ে। একাডেমিক আলোচনায় একই ধরনের ব্যাখ্যাগত পদ্ধতির ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করাই পদ্ধতিগত ন্যায়সংগততার দাবি। |
১০.৩ Cherry-picking আপত্তি : তৃতীয় আপত্তি — এই আলোচনা কি কেবল সুবিধাজনক দৃষ্টান্ত বেছে নিয়ে অসুবিধাজনকগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে? এই প্রবন্ধে এর বিপরীত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফোটনের স্ব-প্রতিসমতা — এই আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তথ্য — সততার সাথে স্বীকৃত হয়েছে, লুকানো হয়নি (§৭.২)। দুটি জনপ্রিয় কিন্তু দুর্বল সাদৃশ্য — তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা (একই বস্তুর দুটি ধর্ম, দুটি সহাবস্থানকারী সত্তা নয়) ও প্রোটন-ইলেকট্রনের "জোড়া" দাবি (সামগ্রিক আধান-নিরপেক্ষতার পরিসংখ্যানগত বিষয় মাত্র) — সচেতনভাবে বাতিল করা হয়েছে। ইবনে আশূরের ৫১:৪৯-এ নর-নারী-অগ্রাধিকারী ভিন্নমত দমন না করে সরাসরি উপস্থাপন করা হয়েছে (§৪.১)। Hydra ও Amoeba-কে জোরপূর্বক দ্বৈততার কাঠামোয় না ফেলে সৎভাবে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (§৭.৮)। প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা মানে দুর্বল উদাহরণ ছেঁটে ফেলা, প্রতিটি সম্ভাব্য সাদৃশ্য অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরা নয়। |
|---|
১০.৪ ইসলামি পণ্ডিত-বিতর্কের স্বীকৃতি : বৈজ্ঞানিক ই'জাজ আন্দোলনের কিছু ব্যাখ্যা নিয়ে মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যেও আভ্যন্তরীণ আপত্তি বিদ্যমান — এই পদ্ধতি ইসলামি পণ্ডিতদের সর্বসম্মত অনুমোদন পায়নি। "তাফসীর ইলমী" (বিজ্ঞানের আলোকে আয়াত বোঝার একটি বিনীত প্রচেষ্টা, যেখানে দাবি করা হয় কুরআনের বর্ণিত সাধারণ নীতি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) এবং "ই'জাজ ইলমী" (একটি অধিকতর দৃঢ় দাবি, যেখানে বলা হয় কুরআন সরাসরি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য পূর্বাভাস দিয়েছে)-এর মধ্যে পার্থক্য করা পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবন্ধ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রথমটির, অধিকতর বিনীত ঘরানায় থাকার চেষ্টা করেছে। |
১১. এই গবেষণার সীমাবদ্ধতা
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কুরআনের প্রতিটি আয়াতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান নয়, কিংবা আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নও নয়। আলোচনার পরিধি কেবল زوج শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক অর্থপরিসর, ক্লাসিক্যাল তাফসির এবং সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক তথ্যের পারস্পরিক সামঞ্জস্য পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ই'রাবি বিশ্লেষণের কিছু অংশ (যেমন مِن-এর তাব'ঈদিয়্যাহ পাঠ) সম্ভাবনাসূচক, চূড়ান্ত নয়। স্ব-প্রতিসম কণার প্রশ্নে প্রদত্ত বিকল্প দ্বৈততা মূল আপত্তিকে অপ্রাসঙ্গিক করে না, বরং ভিন্ন স্তরে দ্বৈততা দেখায়। হুইপটেইলের উৎপত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে উদ্ধৃত জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর নির্ভরশীল, যা ভবিষ্যতের গবেষণায় সংশোধিত হতে পারে। মেটাফিজিক্যাল অংশের প্রশ্নগুলো নিজস্ব সংজ্ঞা অনুযায়ীই অভিজ্ঞতামূলকভাবে অমীমাংসিত থেকে যায়। তাই এখানে উপস্থাপিত সিদ্ধান্তগুলো এই নির্দিষ্ট গবেষণা-প্রশ্নের সীমার মধ্যেই প্রযোজ্য।
১২. উপসংহার
সংক্ষেপে: ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি (زوج = প্রকার/দ্বৈততা, কেবল লিঙ্গ নয়) রাগীব, তাবারী, ইবনে কাসীর, জালালাইন, কুরতুবী, আলূসী ও রাযী — একাধিক প্রামাণিক ও পরস্পর-স্বাধীন সূত্রে এক হাজার বছরেরও আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত। প্রসঙ্গ-নির্ভর বহুঅর্থতার নীতি নির্দিষ্ট নর-নারী আয়াত ও ব্যাপক প্রকার-আয়াতের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রাখে না, এবং ২৭:২৩ আয়াত প্রমাণ করে كُلِّ شَيْءٍ-কে গাণিতিক ব্যতিক্রমহীনতা হিসেবে পড়া কুরআনের নিজস্ব রীতির পরিপন্থী। পদার্থবিজ্ঞান থেকে প্রাণিবিজ্ঞান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্বল সাদৃশ্য সরিয়ে ফেললেও শক্ত উদাহরণ (পদার্থ-প্রতিপদার্থ, DNA ক্ষারক-জোড়া, ফোটন পোলারাইজেশন, হাইব্রিড উৎপত্তির জিনোমীয় প্রমাণ) অক্ষত থাকে, এবং ফোটনের স্ব-প্রতিসমতার মতো প্রকৃত ব্যতিক্রমও সততার সাথে স্বীকৃত হয়েছে। এই ব্যাখ্যা-পদ্ধতিকে ঘিরে ওঠা চারটি স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত আপত্তি — বৈজ্ঞানিক মুজিজা, post-hoc, cherry-picking, double standard — পৃথকভাবে পরীক্ষা করে দেখানো হয়েছে যে এই প্রবন্ধের পদ্ধতি এই আপত্তিগুলোর কোনোটিরই শিকার নয়, বরং সচেতনভাবে সেগুলো এড়ানোর চেষ্টা করেছে।
والله أعلم
تنبيه (বিশেষ সতর্কতা): সময় ও শক্তির নির্দিষ্ট রূপকে زوج নীতির উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন, এবং ফেরেশতা-জিনকে একটি আনুষ্ঠানিক "জোড়া" হিসেবে দাবি করা — এই দুটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তার অভাবে মূল পাঠ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আলোচনা শেষে আলাদা রাখা হয়েছে । |
|---|
গতিশক্তি-স্থিতিশক্তির বিনিময় সংক্রান্ত সতর্কীকরণ: গতিশক্তি-স্থিতিশক্তির বিনিময় এবং সময়ের তাপগতিবিজ্ঞানীয় তীর (Arrow of Time) বনাম মৌলিক সমীকরণের সময়-প্রতিসমতার দ্বৈততা পদার্থবিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা। তবে এগুলোকে সরাসরি زوج-এর শ্রেণিতে রাখার জন্য — বিশেষত শক্তিকে — কোনো ক্লাসিক্যাল মুফাসসির বা আধুনিক ইসলামি দার্শনিক সুনির্দিষ্ট যুক্তি দেননি। এই সংযোগ অনুমানভিত্তিক, তাই মূল পাঠে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফেরেশতা-জিন সংক্রান্ত সতর্কীকরণ: ফেরেশতা ও জিনকে পরস্পরের আনুষ্ঠানিক "জোড়া" বলে উপস্থাপন সম্পর্কে: ইমাম রাযীর তাফসীরে কবীর-এ ফেরেশতা, মানুষ ও জিনকে আলাদা "প্রকার" (شيء) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে — أزواج শব্দের দ্বিতীয় অর্থে। তবে "ফেরেশতা ও জিন পরস্পরের যুগল" — এই সুনির্দিষ্ট দাবি একটি অনুমানভিত্তিক সম্প্রসারণ, যা তৃতীয় শ্রেণির (মেটাফিজিক্যাল) মধ্যে পড়ে এবং অভিজ্ঞতামূলকভাবে যাচাইযোগ্য নয়। তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ: পদার্থ-প্রতিপদার্থের এই সূক্ষ্ম, পরীক্ষাগার-নির্ভর দ্বৈততা মানুষ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রায় তেরোশো বছরেরও অধিক সময় পরে আবিষ্কার করেছে — ডিরাকের তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী ১৯২৮ সালে এবং পজিট্রনের পরীক্ষামূলক আবিষ্কার ১৯৩২ সালে। এই ঐতিহাসিক ব্যবধান ৩৬:৩৬ আয়াতের সেই বাক্যাংশের সাথে একটি সংগতিপূর্ণ পাঠ তৈরি করে, যেখানে জোড়া সৃষ্টির তালিকায় এমন কিছুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে "যা তোমরা জানো না" (وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ) — অর্থাৎ আয়াতের নিজস্ব কাঠামোই একটি বদ্ধ, সপ্তম-শতাব্দীর জ্ঞানভাণ্ডারে সীমাবদ্ধ তালিকা দাবি করে না, বরং ভবিষ্যতের আবিষ্কারের জন্য সুস্পষ্টভাবে জায়গা রেখে দেয়। |
|---|
পরিশিষ্ট :
পরিশিষ্ট ১: ভূমিকা — তারকিব-ই সূরাত ওয়া মাদ্দাহ
ইসলামিক দর্শনে (আল-হিকমাহ বা ইলমুল কালাম) 'তারকিব-ই সূরাত ওয়া মাদ্দাহ' (تركيب صورة ومادة — Composition of Form and Matter) একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। বাংলায় এর অর্থ হলো "আকার (Form) এবং উপাদানের (Matter) সমন্বয় বা যৌথ গঠন।" সহজ কথায়, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু দুটি জিনিসের সমন্বয়ে গঠিত—একটি হলো তার মূল উপাদান বা কাঁচামাল (মাদ্দাহ), আর অন্যটি হলো তার নির্দিষ্ট আকৃতি, বৈশিষ্ট্য বা রূপ (সূরাত)। এই দুইয়ের মিলনকেই দর্শনে 'তারকিব-ই সূরাত ওয়া মাদ্দাহ' বলা হয়।
যেমন—একটি কাঠের চেয়ারের কথা ধরা যাক। এখানে 'কাঠ' হলো মাদ্দাহ (উপাদান); এই কাঠের চেয়ার, টেবিল, দরজা বা নৌকা যেকোনো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ছুতার যখন কাঠটিকে একটি নির্দিষ্ট নকশায় কেটে চেয়ারের রূপ দিলেন, তখন সেটি পেল তার সূরাত (আকার বা রূপ)। কাঠ (মাদ্দাহ) এবং চেয়ারের নকশার (সূরাত) এই সমন্বয়ের (তারকিব) ফলেই আমরা বাস্তবে একটি 'কাঠের চেয়ার' দেখতে পাই। কাঠ ছাড়া চেয়ারের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, আবার কোনো না কোনো রূপ বা আকার ছাড়া শুধু কাঠেরও কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক প্রকাশ সম্ভব নয়।
পরিশিষ্ট ২: জওহর ও আরযের সমন্বয়
যখন বলা হয় "জওহর ও আরযের সমন্বয়", তখন বোঝানো হয় যে—মূল সত্তা (জওহর) এবং তার নানাবিধ গুণ বা রূপের (আরয) একীভূত প্রকাশ। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান প্রতিটি সৃষ্টিই আসলে এই দুটি জিনিসের সমন্বয়।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক:
একটি সোনার আংটির উদাহরণ: এখানে 'সোনা' হলো জওহর (মূল ধাতু বা সত্তা)। আর আংটির 'গোল আকৃতি' কিংবা তার 'উজ্জ্বলতা' হলো আরয (গুণ)। সোনা ছাড়া আংটির আকৃতি অস্তিত্বহীন, আবার কোনো না কোনো আকৃতি (আরয) ছাড়া সোনাকেও (জওহর) বাস্তবে দেখা সম্ভব নয়। এই দুইয়ের সমন্বয়েই আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ 'সোনার আংটি' দেখতে পাই।
পরিশিষ্ট ৩: পুরুষ-নারী উপমা — تَشْبِيهًا بِصِنْفِ الذَّكَرِ وَصِنْفِ الْأُنْثَى
আরবি "تَشْبِيهًا بِصِنْفِ الذَّكَرِ وَصِنْفِ الْأُنْثَى" (তাশবিহান বি-সিনফিজ জাকার ওয়া সিনফিল উনসা) বাক্যাংশটির বাংলা অর্থ হলো—"পুরুষ ও নারী জাতির সদৃশ বা পুরুষ ও নারীবাচক শ্রেণীর সাথে তুলনা করে।" দর্শন, সুফি তত্ত্ব (তাসাউফ) কিংবা প্রাচীন বিজ্ঞানের পরিভাষায় কোনো গভীর বা বিমূর্ত বিষয়কে সহজভাবে বোঝানোর জন্য পুরুষ ও নারীর এই প্রাকৃতিক জোড়াকে একটি রূপক বা উপমা (Analogy) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে 'জওহর' (মূল সত্তা) এবং 'আরয' (বাহ্যিক গুণ বা রূপ)-এর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তুলনাটি চমৎকারভাবে খাটে; যেখানে জওহরকে পুরুষের মতো 'সক্রিয় বা বীজদায়ক' এবং আরয বা উপাদানকে নারীর মতো 'গ্রহণশীল বা রূপদানকারী' হিসেবে কল্পনা করা হয়। ঠিক যেমন পুরুষ ও নারীর মিলনে একটি নতুন প্রাণের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটে, তেমনি মূল সত্তা (পুরুষবাচক প্রতীক) এবং বাহ্যিক গুণাবলীর (নারীবাচক প্রতীক) সমন্বয়ে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পূর্ণতা পায় এবং দৃশ্যমান রূপ ধারণ করে। সংক্ষেপে, লেখক এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আলোচিত তত্ত্ব বা ধারণাটি সৃষ্টির সেই চিরন্তন প্রাকৃতিক নিয়ম—অর্থাৎ পুরুষ ও নারীবাচক দুটি ভিন্ন ও পরিপূরক শ্রেণীর মিলনে যেভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি হয়—ঠিক সেই নিয়মের মতোই বা তারই একটি রূপক প্রকাশ।
পরিশিষ্ট ৪: ই'রাব (الإعراب) পরিচিতি
ই‘রাব (الإعراب) হলো বাক্যে বিভিন্ন عامل (ব্যাকরণগত কার্যকারক)-এর প্রভাবে শব্দের শেষ অক্ষরের হারাকাত বা অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে তার বাক্যগত ভূমিকা (যেমন কর্তা, কর্ম, সম্বন্ধপদ ইত্যাদি) প্রকাশের প্রক্রিয়া।
শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা: «الإعراب هو تغيير أواخر الكلم لاختلاف العوامل الداخلة عليها لفظًا أو تقديرًا»। অর্থাৎ, বিভিন্ন عامل-এর কারণে (প্রকাশ্য বা অনুমিতভাবে) শব্দের শেষাংশে যে পরিবর্তন ঘটে, সেটিই ই‘রাব।
সূত্র:
متن الآجرومية، باب الإعراب (মাতনুল আজরূমিয়্যাহ, ই‘রাব অধ্যায়)
شرح ابن عقيل على ألفية ابن مالك، جـ ١، باب الإعراب (ইবনু আকীল রচিত আলফিয়্যাহ ইবন মালিকের ব্যাখ্যা, ১ম খণ্ড, ই‘রাব অধ্যায়)
جامع الدروس العربية، مصطفى الغلاييني، جـ ١، باب الإعراب (মুস্তফা আল-গালায়িনী, জামিউদ দুরূসিল আরাবিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, ই‘রাব অধ্যায়)
পরিশিষ্ট ৫: সূরা ইয়াসীন (৩৬:৩৬) — আয়াত ও ই'রাব
আয়াত
سُبْحَـٰنَ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلْأَزْوَٰجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنۢبِتُ ٱلْأَرْضُ وَمِنْ أَنفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ ٣٦
অর্থ: পবিত্র ও মহান সে সত্তা যিনি সকল জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যমীন যা উৎপন্ন করেছে তা থেকে, মানুষের নিজদের মধ্য থেকে এবং সে সব কিছু থেকেও যা তারা জানে না।
ই‘রাব
﴿سُبْحَانَ﴾ (সুবহান): এটি একটি উহ্য (অপ্রকাশিত) ক্রিয়ার মাফঊল মুতলাক (পরম কর্ম)। সম্পূর্ণ বাক্যটি ইস্তিনাফিয়া (নতুন সূচনামূলক বাক্য); এর কোনো ই‘রাবগত অবস্থান (মাহাল) নেই।
﴿الَّذِي﴾ (যিনি): এটি মুযাফ ইলাইহ (সম্বন্ধপদ)।
﴿خَلَقَ﴾ (সৃষ্টি করেছেন): অতীতকালবাচক ক্রিয়া। এর কর্তা একটি উহ্য সর্বনাম, যা আল্লাহ তাআলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
﴿الْأَزْوَاجَ﴾ (যুগলসমূহ/প্রকারসমূহ): ক্রিয়ার কর্ম (মাফঊল বিহ)। ﴿خَلَقَ﴾-এর সঙ্গে গঠিত বাক্যটি সিলাতুল মাওসূল (صلة الموصول); এরও কোনো ই‘রাবগত অবস্থান নেই।
﴿كُلَّهَا﴾ (সবগুলো): তাওকীদ (জোর প্রদানকারী শব্দ)।
﴿مِمَّا﴾ (যা থেকে): جار ومجرور (অব্যয় ও তার অনুসর্গ), যা একটি উহ্য হাল (অবস্থাসূচক পদ)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
﴿تُنْبِتُ﴾ (উৎপন্ন করে): বর্তমান/ভবিষ্যৎকালবাচক ক্রিয়া।
﴿الْأَرْضُ﴾ (পৃথিবী): কর্তা (ফায়িল)। ﴿تُنْبِتُ الْأَرْضُ﴾ বাক্যটি সিলাতুল মাওসূল, যার কোনো ই‘রাবগত অবস্থান নেই।
﴿وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ﴾ (এবং তাদের নিজেদের মধ্য থেকে): و (ওয়াও) সংযোজক অব্যয়; جار ومجرور পূর্ববর্তী ﴿مِمَّا﴾-এর ওপর সমন্বিত (আতফ)।
﴿وَمِمَّا﴾ (এবং যা থেকে): এটিও পূর্ববর্তী ﴿مِمَّا﴾-এর ওপর সমন্বিত।
﴿لَا﴾: নাকারের অব্যয়।
﴿يَعْلَمُونَ﴾ (তারা জানে): বর্তমানকালবাচক ক্রিয়া; নূন অক্ষর স্থির থাকার কারণে এটি মারফূ‘। এর কর্তা হলো ওয়াও জামাআহ (واو الجماعة)। ﴿لَا يَعْلَمُونَ﴾ বাক্যটি সিলাতুল মাওসূল, যারও কোনো ই‘রাবগত অবস্থান নেই।
পরিশিষ্ট ৬: সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৯) — আয়াত ও ই'রাব
আয়াত
وَمِنۡ کُلِّ شَیۡءٍ خَلَقۡنَا زَوۡجَیۡنِ لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ
অর্থ: আমি প্রতিটি বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।
ই‘রাব (মূল আরবি)
(وَمِنْ كُلِّ) الواو حرف استئناف وجار ومجرور متعلقان بخلقنا (شَيْءٍ) مضاف إليه (خَلَقْنا) ماض وفاعله (زَوْجَيْنِ) مفعول به والجملة مستأنفة (لَعَلَّكُمْ) لعل واسمها (تَذَكَّرُونَ) مضارع مرفوع والواو فاعله والجملة خبر لعل والجملة الاسمية تعليلية لا محل لها
ই‘রাব (বাংলা ব্যাখ্যা)
﴿وَمِنْ كُلِّ﴾ (আর প্রত্যেকটি থেকে): و (ওয়াও) হলো ইস্তিনাফ (নতুন বাক্য শুরু করার অব্যয়)। ﴿مِنْ كُلِّ﴾ (জার ও মাজরূর) ﴿خَلَقْنَا﴾ (আমরা সৃষ্টি করেছি) ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
﴿شَيْءٍ﴾ (বস্তু): মুযাফ ইলাইহ (সম্বন্ধপদ)।
﴿خَلَقْنَا﴾ (আমরা সৃষ্টি করেছি): অতীতকালবাচক ক্রিয়া। এর কর্তা হলো "نا" (আমরা) সর্বনাম।
﴿زَوْجَيْنِ﴾ (দুই যুগল/দুই প্রকার): ক্রিয়ার কর্ম (মাফঊল বিহ)।
﴿خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ﴾: এটি একটি ইস্তিনাফিয়া (স্বতন্ত্র সূচনামূলক) বাক্য।
﴿لَعَلَّكُمْ﴾ (যাতে তোমরা): لعلّ (আশা বা উদ্দেশ্যবোধক অব্যয়) এবং "كم" তার ইসম (নামপদ)।
﴿تَذَكَّرُونَ﴾ (উপদেশ গ্রহণ কর / স্মরণ কর): বর্তমানকালবাচক ক্রিয়া; এটি لعلّ-এর খবর (বিধেয়)। এর কর্তা হলো ওয়াও জামাআহ (واو الجماعة)।
﴿لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ﴾: এটি একটি নামবাচক (ইসমিয়া) বাক্য, যা কারণ বা উদ্দেশ্য (تعليلية) বোঝায়; এর কোনো ই‘রাবগত অবস্থান (মাহাল) নেই।
পরিশিষ্ট ৭: সূরা ৫১:৪৯-এর বিস্তারিত তাফসীর
৭.১ তাফসীরে ইবন কাসীর
মূল ইবারত:
ومن كل شيء خلقنا زوجين ) صنفين ونوعين مختلفين كالسماء والأرض ، والشمس والقمر ، والليل والنهار ، والبر والبحر ، والسهل والجبل ، والشتاء والصيف ، والجن والإنس ، والذكر والأنثى ، والنور والظلمة ، والإيمان والكفر ، والسعادة والشقاوة ، والحق والباطل ، والحلو والمر . ( لعلكم تذكرون ) فتعلمون أن خالق الأزواج فرد .
অর্থ:
“আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি।” অর্থাৎ, প্রত্যেক জিনিসকে দুই প্রকার বা দুই শ্রেণিতে সৃষ্টি করেছি, যেগুলো পরস্পর ভিন্ন। যেমন—আকাশ ও পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, রাত ও দিন, স্থল ও সমুদ্র, সমতল ভূমি ও পর্বত, শীত ও গ্রীষ্ম, জিন ও মানুষ, পুরুষ ও নারী, আলো ও অন্ধকার, ঈমান ও কুফর, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য, সত্য ও মিথ্যা, মিষ্টি ও তিক্ত।
“যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, যাতে তোমরা উপলব্ধি করতে পার যে, যিনি সব যুগল ও দ্বিবিধ সত্তার স্রষ্টা, তিনি নিজে একক, অদ্বিতীয়; তাঁর কোনো যুগল বা সমকক্ষ নেই।
৭.২ আত-তাফসীরুল মুযাস্সার
মূল ইবারত:
كل شيء من أجناس الموجودات خلقنا نوعين مختلفين؛ لكي تتذكروا قدرة الله، وتعتبروا.
অর্থ: আমি প্রত্যেক বস্তুর বিভিন্ন শ্রেণি ও সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রকার থেকে দুই ধরনের (যুগল) সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহর ক্ষমতার কথা স্মরণ করো এবং তা থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতে পারো।
৭.৩ তাফসীরে কুরতুবী
মূল ইবারত:
قوله تعالى : ومن كل شيء خلقنا زوجين أي صنفين ونوعين مختلفين . قال ابن زيد : أي ذكرا وأنثى وحلوا وحامضا ونحو ذلك . مجاهد . يعني الذكر والأنثى ، والسماء والأرض ، والشمس والقمر ، والليل والنهار ، والنور والظلام ، والسهل والجبل ، والجن والإنس ، والخير والشر ، والبكرة والعشي ، وكالأشياء المختلفة الألوان من الطعوم والأراييح والأصوات . أي جعلنا هذا كهذا دلالة على قدرتنا ، ومن قدر على هذا فليقدر على الإعادة . وقيل : ومن كل شيء خلقنا زوجين لتعلموا أن خالق الأزواج فرد ، فلا يقدر في صفته حركة ولا سكون ، ولا ضياء ولا ظلام ، ولا قعود ولا قيام ، ولا ابتداء ولا انتهاء ; إذ هو عز وجل وتر ليس كمثله شيء لعلكم تذكرون .
অর্থ:
আল্লাহ তাআলার বাণী: “আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি।” অর্থাৎ, প্রত্যেক বস্তুকে দুই প্রকার বা দুই ভিন্ন শ্রেণিতে সৃষ্টি করেছি।
Ibn Zayd বলেন, এর অর্থ হলো—পুরুষ ও নারী, মিষ্টি ও টক এবং এ ধরনের অন্যান্য যুগল।
Mujahid ibn Jabr বলেন, এর মধ্যে রয়েছে—পুরুষ ও নারী, আকাশ ও পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, রাত ও দিন, আলো ও অন্ধকার, সমতল ভূমি ও পর্বত, জিন ও মানুষ, কল্যাণ ও অকল্যাণ, সকাল ও সন্ধ্যা; তদ্রূপ স্বাদ, রং, গন্ধ ও শব্দের দিক থেকে পরস্পর ভিন্ন সব ধরনের বস্তু।
আল্লাহ এসবকে এভাবে যুগল ও বৈচিত্র্যময় করেছেন, যাতে এগুলো তাঁর সর্বশক্তিমান হওয়ার প্রমাণ হয়। আর যিনি এভাবে বিভিন্ন প্রকার সৃষ্টি করতে সক্ষম, তিনি অবশ্যই মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি (পুনরুত্থান) করতেও সক্ষম।
আরও বলা হয়েছে, “আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি”—এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে তোমরা জানতে পার যে যুগলসমূহের স্রষ্টা একক ও অদ্বিতীয়। অতএব, তাঁর সত্তায় গতি বা স্থিরতা, আলো বা অন্ধকার, বসা বা দাঁড়ানো, শুরু বা শেষ—এসব সৃষ্ট বৈশিষ্ট্যের কোনোটি আরোপ করা যায় না। কারণ, তিনি মহিমান্বিত ও মহান, তিনি একক (ওয়িতর); তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই।
“যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, এসব নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আল্লাহর একত্ব ও তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা উপলব্ধি কর।
৭.৪ তাফসীরে তাবারী
মূল ইবারত:
القول في تأويل قوله تعالى : وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (49)
يقول تعالى ذكره: وخلقنا من كل شيء خلقنا زوجين, وترك ( خَلَقْنا ) الأولى استغناء بدلالة الكلام عليها.
واختلف في معنى ( خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ ) فقال بعضهم: عنى به: ومن كلّ شيء خلقنا نوعين مختلفين كالشقاء والسعادة والهدى والضلالة, ونحو ذلك.
ذكر من قال ذلك: حدثني يعقوب بن إبراهيم, قال: ثنا ابن علية, قال: ثنا ابن جريج, قال: قال مجاهد, في قوله ( وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ ) قال: الكفر والإيمان, والشقاوة والسعادة, والهدى والضلالة, والليل والنهار, والسماء والأرض, والإنس والجنّ.
حدثنا ابن بشار, قال: ثنا إبراهيم بن أبي الوزير, قال: ثنا مروان بن معاوية الفزاريُّ, قال: ثنا عوف, عن الحسن, في قوله ( وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ ) قال: الشمس والقمر.
وقال آخرون: عنى بالزوجين: الذكر والأنثى.
ذكر من قال ذلك: حدثني يونس, قال: أخبرنا ابن وهب, قال: قال ابن زيد, في قوله ( وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ ) قال: ذكرًا وأنثى, ذاك الزوجان, وقرأ وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ . قال: امرأته.
وأولى القولين في ذلك قول مجاهد, وهو أن الله تبارك وتعالى, خلق لكلّ ما خلق من خلقه ثانيا له مخالفا في معناه, فكلّ واحد منهما زوج للآخر, ولذلك قيل: خلقنا زوجين. وإنما نبه جلّ ثناؤه بذلك من قوله على قُدرته على خلق ما يشاء خلقه من شيء, وأنه ليس كالأشياء التي شأنها فعل نوع واحد دون خلافه, إذ كلّ ما صفته فعل نوع واحد دون ما عداه كالنار التي شأنها التسخين, ولا تصلح للتبريد, وكالثلج الذي شأنه التبريد, ولا يصلح للتسخين, فلا يجوز أن يوصف بالكمال, وإنما كمال المدح للقادر على فعل كلّ ما شاء فعله من الأشياء المختلفة والمتفقة.
وقوله ( لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ) يقول: لتذكروا وتعتبروا بذلك, فتعلموا أيها المشركون بالله أن ربكم الذي يستوجب عليكم العبادة هو الذي يقدر على خلق الشيء وخلافه, وابتداع زوجين من كلّ شيء لا ما لا يقدر على ذلك.
অর্থ:
“আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”
মহান আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক বস্তু থেকেই দুই ধরনের বা যুগল সৃষ্টি করেছি। এখানে প্রথম “خلقنا” (আমরা সৃষ্টি করেছি) ক্রিয়াটি বাক্যের অর্থে সুস্পষ্ট হওয়ায় পুনরায় উল্লেখ করা হয়নি।
এরপর মুফাসসিরগণ “যুগল” শব্দের অর্থ সম্পর্কে মতভেদ করেছেন।
একদল বলেন, এর অর্থ হলো—প্রত্যেক বস্তুর দুই বিপরীত বা ভিন্ন প্রকার। যেমন—সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য, হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা ইত্যাদি।
এ মতের পক্ষে বর্ণিত হয়েছে যে, Mujahid ibn Jabr বলেছেন: “যুগল” বলতে বোঝানো হয়েছে—কুফর ও ঈমান, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য, হিদায়াত ও ভ্রষ্টতা, রাত ও দিন, আকাশ ও পৃথিবী এবং মানুষ ও জিন।
আর Al-Hasan al-Basri বলেন: এর দ্বারা সূর্য ও চন্দ্র বোঝানো হয়েছে।
অন্য একদল বলেন, “যুগল” বলতে পুরুষ ও নারী বোঝানো হয়েছে।
এ মতের পক্ষে Ibn Zayd বলেন: এর অর্থ হলো—পুরুষ ও নারী; এ দুটিই যুগল। এরপর তিনি আল্লাহর বাণী, “আর আমরা তার স্ত্রীর অবস্থার সংশোধন করে দিয়েছিলাম”—এই আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন, এখানে “যাওজ” বলতে স্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে।
এরপর ইমাম তাবারী বলেন: এ দুই মতের মধ্যে মুজাহিদের মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য এমন একটি দ্বিতীয় সত্তা সৃষ্টি করেছেন, যা কোনো না কোনো দিক থেকে প্রথমটির বিপরীত বা ভিন্ন। এ কারণেই প্রত্যেকটি অপরটির যুগল (زوج) নামে পরিচিত।
আল্লাহ এ কথা উল্লেখ করে তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তিনি এমন নন যে, কেবল এক ধরনের কাজই করতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ, আগুনের স্বভাব শুধু উত্তাপ প্রদান; তা শীতল করতে পারে না। আবার বরফের স্বভাব শুধু শীতল করা; তা উত্তাপ দিতে পারে না। অতএব, যে কেবল একটি কাজই করতে পারে, তাকে পরিপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী বলা যায় না।
পূর্ণ প্রশংসা ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা কেবল তাঁরই, যিনি ইচ্ছামতো সব ধরনের—পরস্পর ভিন্ন কিংবা সাদৃশ্যপূর্ণ—সবকিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম।
“যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, যাতে তোমরা এসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর এবং বুঝতে পার, হে আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপনকারীরা! তোমাদের প্রকৃত রব, যিনি একমাত্র ইবাদতের যোগ্য, তিনিই এমন সত্তা, যিনি প্রত্যেক বস্তুর সঙ্গে তার বিপরীত বা সমজাতীয় যুগল সৃষ্টি করতে সক্ষম। আর যাদের তোমরা তাঁর শরীক বানিয়েছ, তারা এ ক্ষমতার অধিকারী নয়।
৭.৫ আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর
মূল ইবারত :
وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (49)
لما أشعر قوله : { فرشناها فنعم الماهدون } [ الذاريات : 48 ] بأن في ذلك نعمة على الموجودات التي على الأرض ، أُتبع ذلك بصفة خلق تلك الموجودات لما فيه من دلالة على تفرد الله تعالى بالخلق المستلزم لتفرده بالإِلهية فقال : { ومن كل شيء خلقنا زوجين } والزوج : الذكر والأنثى . والمراد بالشيء : النوع من جنس الحيوان . وتثنية زوج هنا لأنه أريد به ما يُزوج من ذكر وأنثى .
وهذا الاستدلال عليهم بخلق يشاهدون كيفياته وأطواره كلما لفتوا أبصارهم ، وقَدحوا أفكارهم ، وهو خلق الذكر والأنثى ليكون منهما إنشاء خلق جديد يخلف ما سلفه وذلك أقرب تمثيل لإِنشاء الخلق بعد الفناء . وهو البعث الذي أنكروه لأن الأشياء تقرّب بما هو واضح من أحوال أمثالها .
ولذلك أتبعه بقوله : { لعلكم تذكرون } ، أي تتفكرون في الفروق بين الممكنات والمستحيلات ، وتتفكرون في مراتب الإِمكان فلا يختلط عليكم الاستبعاد وقلة الاعتياد بالاستحالة فتتوهموا الغريب محالاً .
فالتذكر مستعمل في إعادة التفكر في الأشياء ومراجعة أنفسهم فيما أحالوه ليعلموا بعد إعادة النظر أن ما أحالوه ممكن ولكنهم لم يألفوه فاشتبه عليهم الغريب بالمحال فأحالوه فلما كان تجديد التفكر المغفول عنه شبيهاً بتذكر الشيء المنسي أطلق عليه { لعلكم تذكرون } . وهذا في معنى قوله تعالى : { وما نحن بمسبوقين على أن نبدل أمثالكم وننشئكم فيما لا تعلمون ولقد علمتم النشأة الأولى فلولا تذكرون } [ الواقعة : 60 62 ] فقد ذُيل هنالك بالحث على التذكر ، كما ذيل هنا برجاء التذكر ، فأفاد أن خلق الذكر والأنثى من نطفة هو النشأة الأولى وأنها الدالة على النشأة الآخرة .
وجملة { لعلكم تذكرون } تعليل لجملة { خلقنا زوجين } أي رجاء أن يكون في الزوجين تذكر لكم ، أي دلالة مغفول عنها . والقول في صدور الرجاء من الله مبين عنه قوله تعالى : { ثم عفونا عنكم من بعد ذلك لعلكم تشكرون } في سورة البقرة
অর্থ:
“আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর আমি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছি; অতএব, আমি কতই না উত্তমভাবে তা বিস্তৃত করেছি!” (আয-যারিয়াত: ৪৮)
এই আয়াত পৃথিবীর ওপর বসবাসকারী সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের ইঙ্গিত বহন করে। তাই এর পরপরই তিনি সেই সৃষ্টিগুলোর সৃষ্টি-পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, এতে প্রমাণিত হয় যে, সৃষ্টির একমাত্র অধিকারী আল্লাহ, আর যিনি একমাত্র স্রষ্টা, তিনিই একমাত্র ইলাহ।
এ জন্যই তিনি বলেছেন—“আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি।” এখানে ‘যাওজ’ (زوج) বলতে পুরুষ ও নারী বোঝানো হয়েছে। আর ‘শাই’ (شيء) বলতে প্রাণিজগতের প্রতিটি প্রকার বা জাতিকে বোঝানো হয়েছে। এখানে ‘যাওজ’ শব্দটি দ্বিবচন (زوجين) আকারে এসেছে; কারণ উদ্দেশ্য হলো সেই দুই সত্তা—পুরুষ ও নারী—যাদের মিলনের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টি জন্ম নেয়।
এ আয়াতে এমন একটি বিষয় দ্বারা দলিল দেওয়া হয়েছে, যা মানুষ সর্বদা নিজের চোখে দেখে এবং যার ধাপগুলো নিয়ে চিন্তা করতে পারে। তা হলো—পুরুষ ও নারীর সৃষ্টি এবং তাদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের স্থলাভিষিক্ত হয়।
এটি মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি (পুনরুত্থান)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী উদাহরণ। কারণ, তারা যে পুনরুত্থানকে অস্বীকার করেছিল, তার সম্ভাবনা বোঝাতে এর চেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত আর হতে পারে না। সাধারণত অদৃশ্য বিষয়কে তার সদৃশ দৃশ্যমান বিষয়ের মাধ্যমে মানুষের কাছে স্পষ্ট করা হয়।
এ কারণেই আল্লাহ এর পর বলেছেন—“যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর, সম্ভব ও অসম্ভবের পার্থক্য বুঝতে পার এবং সম্ভাবনার বিভিন্ন স্তর নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পার। তাহলে তোমরা অস্বাভাবিক বা অপরিচিত কোনো বিষয়কে কেবল অভ্যাস না থাকার কারণে অসম্ভব মনে করবে না।
এখানে ‘তাযাক্কুর’ (تذكر) বলতে বোঝানো হয়েছে—কোনো বিষয় নিয়ে পুনরায় চিন্তা করা এবং পূর্ববর্তী ধারণাকে নতুন করে যাচাই করা। অর্থাৎ, তারা যে বিষয়কে অসম্ভব মনে করেছে, তা পুনর্বিবেচনা করলে বুঝবে—তা আসলে অসম্ভব নয়; বরং তাদের কাছে অপরিচিত হওয়ার কারণে তারা সেটিকে অসম্ভব বলে মনে করেছিল।
যেহেতু এই নতুন করে চিন্তা করা ভুলে যাওয়া কোনো বিষয়কে স্মরণ করার মতো, তাই কুরআন একে “তাযাক্কুর” (স্মরণ বা উপদেশ গ্রহণ) শব্দে প্রকাশ করেছে। এ বক্তব্যের অর্থ আল্লাহর অন্য বাণীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ—“আমি কি তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অনুরূপ অন্যদের আনতে এবং তোমাদের এমন রূপে সৃষ্টি করতে অক্ষম, যা তোমরা জানো না? আর তোমরা তো প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে জানো; তবুও কেন শিক্ষা গ্রহণ করো না?” (সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৬০–৬২)
সেখানে যেমন প্রথম সৃষ্টিকে পরকালীন পুনঃসৃষ্টির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে শেষে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, এখানেও তেমনি “যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর” বলে একই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছে।
অতএব, পুরুষ ও নারীর মিলনের মাধ্যমে এক ফোঁটা বীর্য থেকে মানুষের প্রথম সৃষ্টি-প্রক্রিয়াই পরকালীন পুনরুত্থানের সম্ভাবনার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
শেষে “যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর” বাক্যটি “আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি”—এর কারণ বা উদ্দেশ্য হিসেবে এসেছে। অর্থাৎ, যুগল সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন এর মধ্যে এমন এক নিদর্শন খুঁজে পায়, যা নিয়ে তারা আগে উদাসীন ছিল।
আর আল্লাহর পক্ষ থেকে “লাআল্লা” (لعل) বা ‘আশা’ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে সূরা আল-বাকারার এই আয়াতের আলোচনায় এসেছে—“এরপরও আমি তোমাদের ক্ষমা করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা আল-বাকারাহ: ৫২)।
৭.৬ তাফসির আল বাগভী
মূল ইবারত:
( ومن كل شيء خلقنا زوجين ) صنفين ونوعين مختلفين كالسماء والأرض ، والشمس والقمر ، والليل والنهار ، والبر والبحر ، والسهل والجبل ، والشتاء والصيف ، والجن والإنس ، والذكر والأنثى ، والنور والظلمة ، والإيمان والكفر ، والسعادة والشقاوة ، والحق والباطل ، والحلو والمر . ( لعلكم تذكرون ) فتعلمون أن خالق الأزواج فرد .
অর্থ: “আর আমি প্রত্যেক বস্তুকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি”—অর্থাৎ, দুই ভিন্ন প্রকার, শ্রেণি বা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রূপে সৃষ্টি করেছি। যেমন: আকাশ ও পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, রাত ও দিন, স্থল ও সমুদ্র, সমতল ও পর্বত, শীত ও গ্রীষ্ম, জিন ও মানুষ, পুরুষ ও নারী, আলো ও অন্ধকার, ঈমান ও কুফর, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য, সত্য ও মিথ্যা, মিষ্টি ও তিক্ত। “যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর”—অর্থাৎ, এ সকল বিপরীতধর্মী ও বৈচিত্র্যময় যুগল সৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য করে তোমরা উপলব্ধি করতে পারো যে, এদের সকলের স্রষ্টা একক, অদ্বিতীয়; তিনি নিজে কারও যুগল বা সমকক্ষ নন। তাঁরই একত্ব (তাওহীদ) এ সকল সৃষ্টির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।
৭.৭ আত-তাফসীরুল ওয়াসীত
মূল ইবারত:
ثم قال - تعالى - : ( وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ ) أى : نوعين متقابلين كالذكر والأنثى . والليل والنهار ، والسماء والأرض ، والغنى والفقر ، والهدى والضلال .( لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ) أى فعلنا ذلك لعلكم تعتبرون وتتعظون وتتذكرون ما يجب عليكم نحونا من الشكر والطاعة وإخلاص العبادة لنا وحدنا .
অর্থ: অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি।” অর্থাৎ, আমি প্রতিটি জিনিসকে পরস্পর বিপরীত বা পরিপূরক দুই প্রকারে সৃষ্টি করেছি। যেমন—পুরুষ ও নারী, রাত ও দিন, আকাশ ও পৃথিবী, ধনী ও দরিদ্র, হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা। “যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, আমি এভাবে সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর, উপদেশ গ্রহণ কর এবং স্মরণ কর যে, আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আনুগত্য করা এবং একনিষ্ঠভাবে কেবল আমারই ইবাদত করা তোমাদের কর্তব্য।
৭.৮ রূহুল মা‘আনী
মূল ইবারত:
وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ }{وَمِن كُلّ شَىْء} أي من كل جنس من الحيوان {خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ} نوعين ذكرًا وأنثى قاله ابن زيد. وغيره وقال مجاهد: هذا إشارة إلى المتضادات والمتقابلات كالليل. والنهار. والشقوة. والسعادة. والهدى. والضلال. والسماء. والأرض والسواد. والبياض. والصحة. والمرض. إلى غير ذلك، ورجحه الطبري بأنه أدل على القدرة، وقيل: أريد بالجنس المنطقي، وأقل ما يكون تحته نوعان فخلق سبحانه من الجوهر مثلًا المادي والمجرد، ومن المادي النامي والجامد، ومن النامي المدرك والنبات، ومن الدرك الصامت والناطق وهو كما ترى {لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} أي فعلنا ذلك كله كي تتذكروا فتعرفوا أنه عز وجل الرب القادر الذي لا يعجزه شيء فتعملوا قتضاه ولا تعبدوا ما سواه، وقيل: خلقنا ذلك كي تتذكروا فتعلموا أن التعدد من خواص الممكنات وأن الواجب بالذات سبحانه لا يقبل التعدد والانقسام، وقيل: المراد التذكر بجميع ما ذكر لأمر الحشر والنشر لأن من قدر على إيجاد ذلك فهو قادر على إعادة الأموات يوم القيامة وله وجه، وقرأ أبيّ تتذكرون بتاءين وتخفيف الذال.
অর্থ:
“আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”
“প্রত্যেক বস্তু থেকে” অর্থাৎ, প্রত্যেক প্রকার প্রাণিজগত থেকে দুই ধরনের (যুগল) সৃষ্টি করেছি—পুরুষ ও নারী। এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন Ibn Zayd এবং আরও কয়েকজন মুফাসসির।
অপরদিকে Mujahid ibn Jabr বলেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো পরস্পর বিপরীত ও পরিপূরক জোড়াসমূহ। যেমন—রাত ও দিন, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য, হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা, আকাশ ও পৃথিবী, কালো ও সাদা, সুস্থতা ও অসুস্থতা ইত্যাদি। Al-Tabari এই মতকেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন; কারণ এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
আরও একটি মত হলো, এখানে ‘শাই’ (شيء) শব্দটি যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ‘জিনস’ (গণ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি গণের অধীনে অন্তত দুইটি প্রকার (নও‘) থাকে। সে হিসেবে আল্লাহ জওহর (সত্তা)-এর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন বস্তুগত (মাদ্দী) ও অবস্তুগত (মুজাররাদ) প্রকার; বস্তুগতের মধ্যে বৃদ্ধি-প্রাপ্ত (নামী) ও জড় (জামিদ); বৃদ্ধি-প্রাপ্তের মধ্যে অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন (মুদরিক) ও উদ্ভিদ; আর অনুভূতিশক্তিসম্পন্নের মধ্যে নির্বাক ও বাকশক্তিসম্পন্ন। তবে ইমাম আলূসী এ ব্যাখ্যাকে বিশেষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেননি।
“যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, আমি এসব সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে উপলব্ধি করতে পার যে, একমাত্র আল্লাহই সর্বশক্তিমান প্রতিপালক; কোনো কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। অতএব, তোমাদের উচিত তাঁর দাবিকৃত আনুগত্য করা এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করা।
আরও বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো—যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, বহুত্ব ও যুগলতা সৃষ্টজগতের বৈশিষ্ট্য, আর যিনি স্বয়ং অপরিহার্য সত্তা (ওয়াজিবুল উজূদ), তিনি বহুত্ব বা বিভাজন গ্রহণ করেন না। তাই আল্লাহ তাআলা একক ও অদ্বিতীয়।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, এখানে সমস্ত সৃষ্টির যুগলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হাশর ও পুনরুত্থান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। কারণ, যিনি প্রথমবার এত বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি করতে সক্ষম, তিনি কিয়ামতের দিন মৃতদের পুনরুজ্জীবিত করতেও অবশ্যই সক্ষম।
৭.৯ তাফসীরে কবীর
মূল ইবারত:
{وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ )}ثم قال تعالى: {وَمِن كُلّ شَيء خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ} استدلالاً بما بينهما والزوجان إما الضدان فإن الذكر والأنثى كالضدين والزوجان منهما كذلك، وإما المتشاكلان فإن كل شيء له شبيه ونظير وضد وند، قال المنطقيون المراد بالشيء الجنس وأقل ما يكون تحت الجنس نوعان فمن كل جنس خلق نوعين من الجوهر مثلاً المادي والمجرد، ومن المادي النامي والجامد ومن النامي المدرك والنبات من المدرك للناطق والصامت، وكل ذلك يدل على أنه فرد لا كثرة فيه.
وقوله تعالى: {لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} أي لعلّكم تذكرون أن خالق الأزواج لا يكون له زوج وإلا لكان ممكناً فيكون مخلوقاً ولا يكون خالقاً، أو {لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} أن خالق الأزواج لا يعجز عن حشر الأجسام وجمع الأرواح.
অর্থ:
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি।” এটি তাঁর একত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ‘যুগল’ বলতে হয় পরস্পর বিপরীত দুই সত্তা বোঝানো হয়েছে—কারণ পুরুষ ও নারী এক অর্থে পরস্পরের বিপরীত; অথবা এমন দুই সত্তা বোঝানো হয়েছে, যারা পরস্পরের সাদৃশ্যপূর্ণ বা সমজাতীয়। কেননা, প্রতিটি বস্তুরই কোনো না কোনো সদৃশ, সমকক্ষ, বিপরীত বা প্রতিরূপ রয়েছে।
যুক্তিবিদদের মতে, এখানে ‘শাই’ (বস্তু) বলতে ‘জিনস’ (গণ) বোঝানো হয়েছে। আর প্রতিটি গণের অধীনে অন্তত দুইটি প্রকার (নও‘) থাকে। যেমন, আল্লাহ জওহর (সত্তা)-এর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন বস্তুগত (মাদ্দী) ও অবস্তুগত (মুজাররাদ) প্রকার; বস্তুগতের মধ্যে বৃদ্ধি-প্রাপ্ত (নামী) ও জড় (জামিদ); বৃদ্ধি-প্রাপ্তের মধ্যে অনুভূতিশক্তিসম্পন্ন (মুদরিক) ও উদ্ভিদ; আর অনুভূতিশক্তিসম্পন্নের মধ্যে বাকশক্তিসম্পন্ন (নাতিক) ও নির্বাক (সামিত)। এসবই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ একক; তাঁর মধ্যে কোনো বহুত্ব নেই।
এরপর আল্লাহ বলেন, “যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” অর্থাৎ, যাতে তোমরা স্মরণ ও উপলব্ধি করতে পার যে, যিনি যুগলসমূহের স্রষ্টা, তাঁর নিজের কোনো যুগল হতে পারে না। কারণ, যদি তাঁরও কোনো যুগল থাকত, তবে তিনিও সম্ভাব্য অস্তিত্বসম্পন্ন (মুমকিন) হতেন; আর যা সম্ভাব্য অস্তিত্বসম্পন্ন, তা সৃষ্ট—স্রষ্টা নয়।
আবার এ আয়াতের আরেকটি অর্থ হতে পারে—“যাতে তোমরা স্মরণ কর যে, যিনি যুগলসমূহকে সৃষ্টি করতে সক্ষম, তিনি মৃতদেহগুলোকে পুনরায় একত্রিত করা এবং আত্মাগুলোকে পুনঃসংযুক্ত করে পুনরুত্থান ঘটাতেও অবশ্যই সক্ষম।”
৭.১০ আদ্-দুররুল মানসুর ফি আত-তাফসীর বিল-মা'ছূর
মূল ইবারত:
وأخرج ابن جرير وابن المنذر عن مجاهد رضي الله عنه في قوله: {ومن كل شيء خلقنا زوجين} قال: الكفر والإيمان، والشقاء والسعادة، والهدى والضلالة، والليل والنهار، والسماء والأرض، والجن والإنس، والبر والبحر، والشمس والقمر، وبكرة وعشية، ونحو هذا كله.
অর্থ: মুজাহিদ (রহ.) বলেন, আল্লাহর বাণী—“আর আমি প্রত্যেক বস্তুকে যুগলরূপে সৃষ্টি করেছি”—এর ব্যাখ্যায় বলেন: এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে—কুফর ও ঈমান, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য, হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা, রাত ও দিন, আকাশ ও পৃথিবী, জিন ও মানুষ, স্থল ও সমুদ্র, সূর্য ও চন্দ্র, সকাল ও সন্ধ্যা—এবং এ ধরনের সবকিছু।
এই ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহ.) স্পষ্টভাবে "زوجين"-এর উদাহরণ হিসেবে কেবল পুরুষ–নারী নয়; বরং বিপরীত, পরিপূরক ও ভিন্ন শ্রেণির জোড়া উল্লেখ করেছেন। যেমন—ঈমান–কুফর, হিদায়াত–পথভ্রষ্টতা, রাত–দিন, আকাশ–পৃথিবী ইত্যাদি। এটি দেখায় যে, সালাফদের তাফসিরে "زوجين" শব্দের ব্যবহার কেবল লিঙ্গভিত্তিক যুগলে সীমাবদ্ধ ছিল না।
৭.১১ আল কাশফ
মূল ইবারত:
{وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ} أي من كل شيء من الحيوان {خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ} ذكراً وأنثى. وعن الحسن: السماء والأرض، والليل والنهار، والشمس والقمر، والبرّ والبحر، والموت والحياة؛ فعدّد أشياء وقال: كل اثنين منها زوج، والله تعالى فرد لا مثل له {لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ} أي فعلنا ذلك كله من بناء السماء وفرش الأرض وخلق الأزواج إرادة أن تتذكروا فتعرفوا الخالق وتعبدوه.
অর্থ: “‘আর আমি প্রত্যেক বস্তু থেকে যুগল সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।’—এখানে এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক বস্তু’ বলতে প্রাণিজগতের প্রতিটি সৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে; আর ‘যুগল’ বলতে তাদের পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে Hasan al-Basri থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে ‘যুগল’ কেবল পুরুষ–নারী অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আকাশ ও পৃথিবী, রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র, স্থল ও সমুদ্র, মৃত্যু ও জীবন—এ ধরনের পরস্পর-সম্পর্কিত বা বিপরীতধর্মী জোড়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি এসবের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, এদের প্রত্যেকটি একটি ‘যুগল’; পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা একক, তাঁর কোনো সমকক্ষ বা সদৃশ নেই। অতঃপর ‘যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’—এর অর্থ হলো, আকাশ নির্মাণ, পৃথিবী বিছিয়ে দেওয়া এবং যুগল সৃষ্টি—এসবই এ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যেন তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে প্রকৃত স্রষ্টাকে চিনতে পারো এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করো।”
পরিশিষ্ট ৮: সূরা ৩৬:৩৬-এর বিস্তারিত তাফসীর
৮.১ তাফসির আল-জালালাইন
মূল ইবারত:
﴿سُبۡحَـٰنَ ٱلَّذِی خَلَقَ ٱلۡأَزۡوَ ٰجَ﴾ الْأَصْنَاف ﴿كُلَّهَا مِمَّا تُنۢبِتُ ٱلۡأَرۡضُ﴾ مِنْ الْحُبُوب وَغَيْرهَا ﴿وَمِنۡ أَنفُسِهِمۡ﴾ مِنْ الذُّكُور وَالْإِنَاث ﴿وَمِمَّا لَا یَعۡلَمُونَ ٣٦﴾ مِنْ الْمَخْلُوقَات الْعَجِيبَة الْغَرِيبَة
অর্থ: “পবিত্র তিনি, যিনি সকল প্রকার জোড়া বা শ্রেণি সৃষ্টি করেছেন—যা পৃথিবী উৎপন্ন করে, শস্য ও অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে; এবং তাদের নিজেদের মধ্য থেকেও, অর্থাৎ পুরুষ ও নারী; আর এমন সব সৃষ্টিও, যাদের সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না—যেসব বিস্ময়কর ও অদ্ভুত সৃষ্টি রয়েছে।”
৮.২ তাফসির আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর
মূল ইবারত:
﴿سُبْحانَ الَّذِي خَلَقَ الأزْواجَ كُلَّها مِمّا تُنْبِتُ الأرْضُ ومِن أنْفُسِهِمْ ومِمّا لا يَعْلَمُونَ﴾ اعْتِراضٌ بَيْنَ جُمْلَةِ ﴿وآيَةٌ لَهُمُ الأرْضُ﴾ [يس: ٣٣] وجُمْلَةِ ﴿وآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ﴾ [يس: ٣٧]، أثارَهُ ذِكْرُ إحْياءِ الأرْضِ وإخْراجِ الحَبِّ والشَّجَرِ مِنها؛ فَإنَّ في ذَلِكَ أحْوالًا وإبْداعًا عَجِيبًا يُذَكِّرُ بِتَعْظِيمِ مُودِعِ تِلْكَ الصَّنائِعِ بِحِكْمَتِهِ وذَلِكَ تَضَمَّنَ الِاسْتِدْلالُ بِخَلْقِ الأزْواجِ عَلى طَرِيقَةِ الإدْماجِ...
(সম্পূর্ণ মূল আরবি ইবারত অত্যন্ত দীর্ঘ; সারমর্ম নিচে বাংলা অনুবাদে দেওয়া হলো, মূল বক্তব্যের কোনো অংশ বাদ না দিয়ে।)
অর্থ:
“পবিত্র তিনি, যিনি সব ধরনের যুগল বা শ্রেণি সৃষ্টি করেছেন—যা পৃথিবী উৎপন্ন করে, তাদের নিজেদের মধ্য থেকে এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না।”
এই বাক্যটি “তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো পৃথিবী” (৩৩ নং আয়াত) এবং “তাদের জন্য আরেকটি নিদর্শন হলো রাত্রি” (৩৭ নং আয়াত)-এর মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তী মন্তব্য (اعتراض)। মৃত পৃথিবীকে জীবিত করা এবং তা থেকে শস্য ও বৃক্ষ উৎপন্ন করার আলোচনা থেকেই এ বাক্যের অবতারণা হয়েছে। কারণ এসবের মধ্যে আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশৈলীর এমন বিস্ময়কর প্রকাশ রয়েছে, যা মানুষকে সেই মহান স্রষ্টার পবিত্রতা ও মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এখানে যুগল সৃষ্টি সম্পর্কে উল্লেখের মাধ্যমে তাঁর একত্ব ও সৃষ্টিশক্তির আরেকটি প্রমাণও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংযোজিত হয়েছে।
এখানে “সুবহান” শব্দটি আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁকে মুশরিকদের আরোপিত সব অপূর্ণতা ও অনুপযুক্ত বিষয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করা। এসব অপূর্ণতার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হলো তাঁর সঙ্গে শরীক স্থাপন করা, এবং এখানে মূলত সেটিই উদ্দেশ্য।
আল্লাহর নামের পরিবর্তে “যিনি সৃষ্টি করেছেন”—এই বিশেষণযুক্ত বর্ণনা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে বোঝানো হয় যে তাঁর সৃষ্টি-ক্ষমতাই তাঁকে পবিত্র ও মহিমান্বিত ঘোষণার অন্যতম প্রধান কারণ।
“الأزواج” (যুগল/জোড়া)-এর অর্থ
“যুগল” শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে—
প্রথম অর্থ: পুরুষ ও নারী—অর্থাৎ প্রাণীকুলের নর ও মাদী।
দ্বিতীয় অর্থ: বিভিন্ন প্রকার, শ্রেণি ও জাতি, যেমন আল্লাহ বলেছেন: “অতঃপর আমরা তা দ্বারা বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।” (সূরা ত্ব-হা: ৫৩)
ইমাম ইবন আশূর বলেন, প্রথম অর্থটিই অধিক প্রচলিত। সে অর্থ গ্রহণ করলে আয়াতটি প্রাণিজগতের পুরুষ-নারী সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তখন “من” (মিন) তিন জায়গাতেই আরম্ভবাচক (ابتدائية) হবে এবং “خلق” (সৃষ্টি করেছেন)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।
এখানে আরেকটি নিদর্শনের কথাও সূক্ষ্মভাবে যুক্ত হয়েছে। প্রাণীজগতের সৃষ্টি, তার বংশবিস্তার, প্রজাতি সংরক্ষণ এবং মানুষের জন্য তার নানাবিধ উপকারিতা—এসব আল্লাহর সৃষ্টিশৈলীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও গভীর নিদর্শনগুলোর একটি। এ কারণেই অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় প্রাণীর সৃষ্টিকে বিশেষভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন উদ্ভিদের কথা আগে এসেছে?
আয়াতে প্রথমে বলা হয়েছে—“যা পৃথিবী উৎপন্ন করে”—কারণ উদ্ভিদই প্রাণিজগতের জীবনের মূল উপাদান। প্রাণীর খাদ্য উদ্ভিদ থেকে আসে। খাদ্য থেকে দেহ গঠিত হয়, দেহ থেকে বংশবিস্তারের উপকরণ সৃষ্টি হয়। তাই উদ্ভিদের উল্লেখ প্রাণিজগতের পূর্বে এসেছে।
এরপর বলা হয়েছে—“তাদের নিজেদের মধ্য থেকে”—অর্থাৎ মানুষের মধ্যেই পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে মানুষের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ এই নিদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের প্রধান লক্ষ্য মানুষই।
“এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না”
এই অংশের অর্থ হলো—আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মধ্যে এমন অসংখ্য রহস্য, বৈশিষ্ট্য ও সূক্ষ্ম নিয়ম সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যা মানুষের পূর্ণ জ্ঞানের বাইরে। মানুষ সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে সৃষ্টির মধ্যে গভীর রহস্য রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর প্রকৃত স্বরূপ সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে না।
এর অন্যতম উদাহরণ হলো রূহ (আত্মা)। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: “বলুন, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশের বিষয়; আর তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে খুব সামান্য।” (সূরা আল-ইসরা: ৮৫)
মানুষ যুগে যুগে গবেষণা, আবিষ্কার ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের নতুন নতুন রহস্য জানতে পারে। কিন্তু তবুও অসংখ্য বিষয় মানুষের জ্ঞানের অগোচরই থেকে যায়। তাই “যা তারা জানে না”—এই বাক্যটি সব যুগের মানুষের জন্যই সত্য।
দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করলে
যদি “الأزواج” শব্দের অর্থ বিভিন্ন প্রকার ও শ্রেণি ধরা হয়, তাহলে “من” তিন জায়গাতেই বর্ণনামূলক (بيانية) হবে। তখন অর্থ হবে—“তিনি সব ধরনের শ্রেণি সৃষ্টি করেছেন—অর্থাৎ পৃথিবীর উৎপন্ন বস্তুসমূহ, মানুষের নিজস্ব প্রজাতি এবং এমন সব সৃষ্টি, যা তারা জানে না।”
এখানে “যা তারা জানে না” বলার মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এমন কিছু সৃষ্টি রয়েছে যা তারা জানে, আবার আরও অসংখ্য সৃষ্টি রয়েছে যা তারা জানে না। উদ্ভিদের কথা আগে বলা হয়েছে, কারণ মানুষের ও পশুর জীবিকা তার ওপর নির্ভরশীল। এরপর মানুষের নিজের সৃষ্টি উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ মানুষের নিজের অস্তিত্বের মধ্যে চিন্তা-ভাবনার সবচেয়ে শক্তিশালী নিদর্শন রয়েছে। তারপর এমন সব সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, যা মানুষের জানা ও অজানা—উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে; সব দেশ, সব যুগ ও সব সময়ে।
পরিশেষে, “তাদের নিজেদের”-এর সর্বনামটি পূর্বে উল্লিখিত মানুষদের দিকেই ফিরে যায়; বিশেষত সেইসব লোকদের প্রতি, যারা রাসূল ﷺ-কে অস্বীকার করেছিল। তাদের সামনে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিশক্তির এসব সুস্পষ্ট নিদর্শন উপস্থাপন করে তাঁর একত্ব ও পুনরুত্থানের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।
৮.৩ তাফসীরে তাবারী
মূল ইবারত:
القول في تأويل قوله تعالى : سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لا يَعْلَمُونَ (36)
يقول تعالى ذكره تنـزيها وتبرئة للذي خلق الألوان المختلفة كلها من نبات الأرض، ومن أنفسهم، يقول: وخلق من أولادهم ذكورًا وإناثًا، ومما لا يعلمون أيضًا من الأشياء التي لم يطلعهم عليها، خلق كذلك أزواجًا مما يضيف إليه هؤلاء المشركون، ويصفونه به من الشركاء وغير ذلك.
অর্থ:
“পবিত্র তিনি, যিনি সকল যুগল সৃষ্টি করেছেন।”
অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্রতা ও সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দিচ্ছেন। তিনিই পৃথিবী থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ ও ফসল সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের নিজেদের মধ্য থেকেও যুগল সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, তাদের সন্তানদের মধ্যে পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করেছেন।
“এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না।” অর্থাৎ, তিনি এমন বহু সৃষ্টি যুগল আকারে সৃষ্টি করেছেন, যেগুলোর সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা হয়নি এবং যেগুলোর জ্ঞান তাদের কাছে পৌঁছেনি।
অতএব, যিনি এভাবে সমস্ত সৃষ্টির যুগল ও বিভিন্ন প্রকার সৃষ্টি করেছেন, তিনি সেই মহান আল্লাহ, যিনি মুশরিকরা তাঁর সঙ্গে যেসব শরীক ও অংশীদার সাব্যস্ত করে এবং তাঁর প্রতি যেসব মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, সেসব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মহিমান্বিত।
৮.৪ তাফসীরে আলূসী
মূল ইবারত:
والمراد بالأزواج الأنواع والأصناف، وقال الراغب: الأزواج جمع زوج، ويقال لكل واحد من القرينين، ولكل ما يقترن بآخر مماثلًا له أو مضادًا، وكل ما في العالم زوج من حيث أن له ضدًا ما أو مثلًا ما أو تركيبًا ما، بل لا ينفك بوجه من تركيب صورة ومادة وجوهر وعرض.
بيان للأزواج، والمراد به كل ما ينبت فيها من الأشياء المذكورة وغيرها.
أي وخلق الأزواج من أنفسهم، أي الذكر والأنثى.
أي والأزواج مما لم يطلعهم الله تعالى ولم يجعل لهم طريقًا إلى معرفته بخصوصياته، وإنما أطلعهم سبحانه على ذلك بطريق الإجمال على منهاج: ﴿وَيَخْلُقُ مَا لَا تَعْلَمُونَ﴾ [النحل: ٨]؛ لما نيط به وقوفهم على عظم قدرته وسعة ملكه وجلال سلطانه عز وجل.
ولعله لما كان العلم من أخص صفات الربوبية لم يثبت على وجه الكمال والإحاطة لأحد سواه سبحانه، ولو كان بطريق الفيض منه تبارك وتعالى، على أن ظرف الممكن يضيق عن الإحاطة، فما يجهله كل أحد أكثر مما يعلمه بكثير.
وقد يقال على بعض الاعتبارات: إن ما يعلمه كل أحد متناه، وما يجهله غير متناه، ولا نسبة بين المتناهي وغير المتناهي أصلًا، فلا نسبة بين معلوم كل أحد ومجهوله.
وتأمل في هذا مع دعوى بعض الأكابر الوقوف على الأعيان الثابتة والاطلاع عليها، وقل: ﴿رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا﴾.
অর্থ:
এখানে “আযওয়াজ” বলতে বিভিন্ন প্রকার, শ্রেণি ও জাতি বোঝানো হয়েছে। রাগীব আল স্পাহানি বলেন, “যাওজ” শব্দটি এমন দুটি সত্তার প্রত্যেকটির জন্য ব্যবহৃত হয়, যারা পরস্পরের সঙ্গী। আবার এমন প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রেও এ শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা অন্য কিছুর সঙ্গে সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য বা কোনো সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্ত। বরং এ জগতের প্রতিটি সৃষ্টিই কোনো না কোনো অর্থে যুগল—কখনো বিপরীতের সঙ্গে, কখনো সমজাতীয়ের সঙ্গে, আবার কখনো উপাদান ও আকৃতির সমন্বয়ে।
“যা পৃথিবী উৎপন্ন করে” অর্থাৎ, পৃথিবীতে উৎপন্ন সব ধরনের উদ্ভিদ ও অন্যান্য সৃষ্টি—যেগুলো বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রকারে বিভক্ত।
“এবং তাদের নিজেদের মধ্য থেকে” অর্থাৎ, মানুষের মধ্যেও তিনি যুগল সৃষ্টি করেছেন—পুরুষ ও নারী।
“এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না” অর্থাৎ, আল্লাহ এমন অসংখ্য প্রকারের সৃষ্টি করেছেন, যেগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা হয়নি এবং সেগুলো জানার কোনো উপায়ও তাদের দেওয়া হয়নি। তবে সামগ্রিকভাবে আল্লাহ তাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর অগণিত সৃষ্টি রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেন—“আর তিনি এমন অনেক কিছু সৃষ্টি করেন, যা তোমরা জানো না।” (সূরা আন-নাহল : ৮)
এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সীমাহীন রাজত্ব ও মহিমান্বিত কর্তৃত্ব সম্পর্কে সচেতন করা। জ্ঞান যেহেতু রবুবিয়্যাতের অন্যতম বিশেষ গুণ, তাই পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই। তিনি যত জ্ঞানই তাঁর সৃষ্টিকে দান করুন না কেন, কোনো সৃষ্টিই সবকিছু পরিবেষ্টন করে জানতে পারে না। বরং মানুষের অজানার পরিধি তার জানা বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি এক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, মানুষের জানা বিষয় সীমিত, কিন্তু তার অজানা বিষয় অসীম। সীমিত ও অসীমের মধ্যে যেমন কোনো তুলনা হয় না, তেমনি মানুষের জ্ঞাত বিষয়ের সঙ্গে তার অজ্ঞাত বিষয়েরও কোনো তুলনা হয় না। এ প্রসঙ্গে ইমাম আলূসী শেষদিকে ইঙ্গিত করেন যে, কেউ যদি উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থার দাবি করে বিভিন্ন গুপ্ত বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের কথা বলে, তবুও তার উচিত বিনয়ের সঙ্গে সর্বদা এই দোয়া করা—“হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরা ত্ব-হা: ১১৪)
৮.৫ তাফসীরে কবীর
মূল ইবারত (প্রথম অংশ):
{سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ (36)}وأخرج ابن المنذر عن ابن جريج في قوله: {سبحان الذي خلق الأزواج كلها} قال: الأصناف كلها. الملائكة زوج، والإِنس زوج، والجن زوج، وما تنبت الأرض زوج، وكل صنف من الطير زوج، ثم فسر فقال: {مما تنبت الأرض ومن أنفسهم ومما لا يعلمون} الروح لا يعلمه الملائكة ولا خلق الله، ولم يطلع على الروح أحد وقوله: {ومما لا يعلمون} لا يعلم الملائكة ولا غيرها.
অর্থ:
“পবিত্র তিনি, যিনি সব ধরনের যুগল সৃষ্টি করেছেন”—এখানে ‘যুগল’ বলতে সমস্ত প্রকার ও শ্রেণি বোঝানো হয়েছে।
ফেরেশতারা এক প্রকার (যুগল), মানুষ এক প্রকার (যুগল), জিন এক প্রকার (যুগল), পৃথিবী যা উৎপন্ন করে তা এক প্রকার (যুগল), এবং প্রত্যেক প্রজাতির পাখিও এক একটি প্রকার (যুগল)।
এরপর তিনি আয়াতের ব্যাখ্যা করে বলেন: “যা পৃথিবী উৎপন্ন করে, তাদের নিজেদের মধ্য থেকে এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না।” রূহ (আত্মা) এমন একটি বিষয়, যার প্রকৃত স্বরূপ ফেরেশতারাও জানে না, অন্য কোনো সৃষ্টিও জানে না। আল্লাহ তাআলা রূহের প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে কাউকে অবহিত করেননি।
আর “যা তারা জানে না”—এর অর্থ হলো, এমন বিষয় যা ফেরেশতারা কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিই জানে না।
মূল ইবারত (দ্বিতীয় অংশ):
{سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ (36)}قد ذكرنا أن لفظة سبحان علم دال على التسبيح وتقديره سبح تسبيح الذي خلق الأزواج كلها، ومعنى سبح نزه، ووجه تعلق الآية بما قبلها هو أنه تعالى لما قال: {أَفلاَ يَشْكُرُونَ} [يس: 35] وشكر الله بالعبادة وهم تركوها ولم يقتنعوا بالترك بل عبدوا غيره وأتوا بالشرك فقال: سبحان الذي خلق الأزواج وغيره لم يخلق شيئاً فقال أو نقول، لما بين أنهم أنكروا الآيات ولم يشكروا بين ما ينبغي أن يكون عليه العاقل فقال: {سبحان الذي خَلَق الأزواج كُلَّهَا} أو نقول لما بين الآيات قال: سبحان الذي خلق ما ذكره عن أن يكون له شريك أو يكون عاجزاً عن إحياء الموتى وفيه مسائل:
المسألة الأولى: قوله: {كُلَّهَا} يدل على أن أفعال العباد مخلوقة لله لأن الزوج هو الصنف وأفعال العباد أصناف ولها أشباه هي واقعة تحت أجناس الأعراض فتكون من الكل الذي قال الله فيها إنه خلق الأزواج كلها، لا يقال مما تنبت الأرض، يخرج الكلام عن العموم لأن من قال أعطيت زيداً كل ما كان لي يكون للعموم إن اقتصر عليه، فإذا قال بعده من الثياب لا يبقى الكلام على عمومه لأنا نقول ذلك إذا كانت من لبيان التخصيص، أما إذا كانت لتأكيد العموم فلا، بدليل أن من قال أعطيته كل شيء من الدواب والثياب والعبيد والجواري يفهم منه أنه يعدد الأصناف لتأكيد العموم ويؤيد هذا قوله تعالى في حم: {الذي خَلَق الأزواج كُلَّهَا وَجَعَلَ لَكُمْ مّنَ الفلك والأنعام مَا تَرْكَبُونَ} [الزخرف: 12] من غير تقييد.
المسألة الثانية: ذكر الله تعالى أموراً ثلاثة ينحصر فيها المخلوقات فقوله: {مِمَّا تُنبِتُ الأرض} يدخل فيها ما في الأرض من الأمور الظاهرة كالنبات والثمار وقوله: {وَمِنْ أَنفُسِهِمْ} يدخل فيها الدلائل النفسية وقوله: {وَمِمَّا لاَ يَعْلَمُونَ} يدخل ما في أقطار السموات وتخوم الأرضين وهذا دليل على أنه لم يذكر ذلك للتخصيص بدليل أن الأنعام مما خلقها الله والمعادن لم يذكرها وإنما ذكر الأشياء لتأكيد معنى العموم كما ذكرنا في المثال.
المسألة الثالثة: قوله: {وَمِمَّا لاَ يَعْلَمُونَ} فيه معنى لطيف وهو أنه تعالى إنما ذكر كون الكل مخلوقاً لينزه الله عن الشريك فإن المخلوق لا يصلح شريكاً للخلق، لكن التوحيد الحقيقي لا يحصل إلا بالاعتراف بأن لا إله إلا الله، فقال تعالى اعلموا أن المانع من التشريك فيما تعلمون وما لا تعلمون لأن الخلق عام والمانع من الشركة الخلق فلا تشركوا بالله شيئاً مما تعلمون فإنكم تعلمون أنه مخلوق ومما لا تعلمون فإنه عند الله كله مخلوق لكون كله ممكناً.
অর্থ:
“পবিত্র তিনি, যিনি সব ধরনের যুগল সৃষ্টি করেছেন।”
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, ‘সুবহান’ শব্দটি তাসবীহ (আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা)-এর জন্য নির্দিষ্ট একটি বিশেষ শব্দ। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—“সেই মহান সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করো, যিনি সমস্ত যুগল সৃষ্টি করেছেন।” ‘সাব্বাহা’ (سبح) অর্থ—পবিত্র ও সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত ঘোষণা করা।
এই আয়াতের সঙ্গে পূর্ববর্তী আয়াতের সম্পর্ক হলো—আল্লাহ যখন বললেন, “তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (ইয়াসীন: ৩৫) তখন এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহর শোকর আদায়ের প্রকৃত রূপ হলো তাঁর ইবাদত করা। অথচ তারা শুধু ইবাদতই পরিত্যাগ করেনি, বরং অন্যদেরও তাঁর সঙ্গে শরীক করেছে। তাই আল্লাহ বললেন—“পবিত্র তিনি, যিনি সমস্ত যুগল সৃষ্টি করেছেন।” অর্থাৎ, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সঙ্গে এমন কাউকে কীভাবে শরীক করা যায়, যে কিছুই সৃষ্টি করেনি?
অথবা এভাবেও বলা যায়, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করার পর এখানে ঘোষণা করেছেন—“পবিত্র তিনি, যিনি এসব সৃষ্টি করেছেন।” অর্থাৎ, তিনি শরীক গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র এবং মৃতকে পুনর্জীবিত করতে অক্ষম হওয়া থেকেও সম্পূর্ণ পবিত্র।
এরপর ইমাম রাযী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।
প্রথম আলোচনা
আল্লাহর বাণী—﴿كُلَّهَا﴾ (সবগুলো)—এই শব্দটি প্রমাণ করে যে, মানুষের কর্মও আল্লাহর সৃষ্ট। কারণ, ‘যুগল’ বলতে বিভিন্ন প্রকার ও শ্রেণি বোঝায়। মানুষের কর্মও বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত এবং সেগুলোও সৃষ্ট বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। তাই এগুলোও আল্লাহর সেই উক্তির অন্তর্ভুক্ত—“তিনি সব ধরনের যুগল সৃষ্টি করেছেন।”
কেউ যদি বলেন, “যা পৃথিবী উৎপন্ন করে”—এই বাক্যাংশ সাধারণ অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দেয়, তাহলে তার জবাবে বলা হবে—এটি তখনই সীমাবদ্ধ করবে, যখন ‘মিন’ (من) দ্বারা বিশেষীকরণ বোঝানো হবে। কিন্তু এখানে ‘মিন’ এসেছে সাধারণ অর্থকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
যেমন কেউ যদি বলে—“আমি তাকে সব ধরনের জিনিস দিয়েছি—পশু, কাপড়, দাস-দাসী।” তখন সে বিভিন্ন শ্রেণির উল্লেখ করে সাধারণ অর্থকেই আরও শক্তিশালী করছে।
এ ব্যাখ্যার সমর্থনে আল্লাহর অন্য বাণীও রয়েছে—“যিনি সব ধরনের যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য নৌযান ও গবাদিপশু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ কর।” (সূরা আয-যুখরুফ: ১২) সেখানে কোনো সীমাবদ্ধতার উল্লেখ নেই।
দ্বিতীয় আলোচনা
এ আয়াতে আল্লাহ এমন তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে সমস্ত সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
প্রথম: “যা পৃথিবী উৎপন্ন করে”—এতে পৃথিবীর দৃশ্যমান সবকিছু—উদ্ভিদ, ফলমূল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়: “তাদের নিজেদের মধ্য থেকে”—এতে মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব ও তার ভেতরের নিদর্শনসমূহ অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয়: “এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না”—এতে আকাশমণ্ডলী, পৃথিবীর গভীর স্তর এবং মানুষের অজানা সমগ্র সৃষ্টিজগৎ অন্তর্ভুক্ত।
এ থেকেই বোঝা যায়, এখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করার উদ্দেশ্য অন্যগুলোকে বাদ দেওয়া নয়। কারণ, গবাদিপশু ও খনিজ পদার্থও আল্লাহর সৃষ্টি; অথচ এখানে সেগুলোর পৃথক উল্লেখ নেই। বরং কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করে সাধারণ অর্থকে আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
তৃতীয় আলোচনা
আল্লাহর বাণী—﴿وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ﴾ (এবং এমন সবকিছু থেকেও, যা তারা জানে না)—এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে।
আল্লাহ সমস্ত কিছুকে তাঁর সৃষ্টি বলে উল্লেখ করেছেন, যাতে প্রমাণিত হয়—তিনি শরীক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কারণ, যা সৃষ্টি, তা কখনো স্রষ্টার শরীক হতে পারে না।
কিন্তু প্রকৃত তাওহীদ তখনই পূর্ণতা লাভ করে, যখন মানুষ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর স্বীকৃতি দেয়।
তাই আল্লাহ যেন বলছেন—তোমরা জেনে রাখো, তোমরা যা জানো এবং যা জানো না—উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা নিষিদ্ধ। কারণ, সৃষ্ট হওয়াই শরীক হওয়ার প্রতিবন্ধক। সুতরাং, তোমরা যেসব বস্তুকে জানো, সেগুলোর কোনোটিকেই আল্লাহর শরীক করো না; কারণ তোমরা জানো যে সেগুলো সৃষ্ট। আর যেগুলো তোমরা জানো না, সেগুলোকেও শরীক করো না; কারণ আল্লাহর কাছে সেগুলোও সমানভাবে সৃষ্ট। অতএব, যেহেতু সবকিছুই সৃষ্ট, তাই ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহই।
পরিশিষ্ট ৯: সম্পর্কিত আয়াতসমূহ (কুরআনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত)
وَأَنَّهُۥ خَلَقَ ٱلزَّوۡجَيۡنِ ٱلذَّكَرَ وَٱلۡأُنثَىٰ আর এই যে, তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল-পুরুষ ও নারী
فَجَعَلَ مِنۡهُ ٱلزَّوۡجَيۡنِ ٱلذَّكَرَ وَٱلۡأُنثَىٰٓ এরপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল-নর ও নারী। — Al-Quran: 75:39
سُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡأَزۡوَٰجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنۢبِتُ ٱلۡأَرۡضُ وَمِنۡ أَنفُسِهِمۡ وَمِمَّا لَا يَعۡلَمُونَ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি উদ্ভিদ, মানুষ এবং এরা যাদেরকে জানে না তাদের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেছেন জোড়া জোড়া করে। — Al-Quran: 36:36
وَمِن كُلِّ شَيۡءٍ خَلَقۡنَا زَوۡجَيۡنِ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ আর প্রত্যেক বস্তু আমি সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। — Al-Quran: 51:49
وَهُوَ ٱلَّذِي مَدَّ ٱلۡأَرۡضَ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَٰسِيَ وَأَنۡهَٰرٗاۖ وَمِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ جَعَلَ فِيهَا زَوۡجَيۡنِ ٱثۡنَيۡنِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَتَفَكَّرُونَ তিনিই ভূতলকে বিস্তৃত করেছেন এবং এতে পর্বত ও নদী সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক প্রকারের ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। তিনি দিবসকে রাত্রি দিয়ে আচ্ছাদিত করেন। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে। — Al-Quran: 13:3
إِنِّي وَجَدتُّ ٱمۡرَأَةٗ تَمۡلِكُهُمۡ وَأُوتِيَتۡ مِن كُلِّ شَيۡءٖ وَلَهَا عَرۡشٌ عَظِيمٞ ‘আমি তো এক নারীকে দেখলাম এদের ওপর রাজত্ব করছে। তাকে দেওয়া হয়েছে সকল কিছু হতেই এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। — Al-Quran: 27:23
পরিশিষ্ট ১০: ভাষাতাত্ত্বিক (আরবি লুগাহ) সূত্র
ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব, মাদ্দাহ "ز و ج" [খণ্ড/পৃষ্ঠা যাচাই করুন]। زَوْج (জাওজ)-এর মূল অর্থ: জোড়ার একটি অংশ, সঙ্গী, প্রকার — একই জাতের বা বিপরীত জাতের দুটি জিনিসের মিলন। আধুনিক ব্যবহারেও زوج جوارب (এক জোড়া মোজা)-র মতো প্রয়োগ প্রচলিত, যা প্রমাণ করে শব্দটি নর-নারীর সীমার বাইরেও স্বাভাবিক ব্যবহারের অংশ।
আহমদ ইবনে ফারিস (মৃ. ৩৯৫ হি.), মুজামু মাকাইয়িসিল লুগাহ, মাদ্দাহ "ز و ج" [খণ্ড/পৃষ্ঠা যাচাই করুন]। ইবনে ফারিসের কিয়াস-পদ্ধতি অনুযায়ী ز-و-ج ধাতুর কেন্দ্রীয় ভাব: مقارنة الشيء بصاحبه (একটি বস্তুর তার প্রতিরূপ/সহচরের সাথে সংযুক্তি)। উল্লেখ্য, মূল ধাতুগত অর্থে নির্দিষ্টভাবে পুরুষত্ব/নারীত্ব অনুপস্থিত — এটি নর-নারী, জুতার জোড়া, বা বিপরীত প্রকারে পরবর্তীতে প্রসঙ্গ-নির্ভর প্রয়োগ মাত্র।
রাগিব আল-ইসফাহানী (আনু. ৫ম হি. শতাব্দী), মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন, কিতাবুয যা, মাদ্দাহ "زوج" [খণ্ড/পৃষ্ঠা যাচাই করুন]। রাগিব উভয় ব্যবহার নথিভুক্ত করেন — নির্দিষ্ট স্বামী/স্ত্রী অর্থ (সূরা আল-বাকারাহ ২:৩৫-এর প্রসঙ্গে) এবং ব্যাপক "قرين" (যা অন্য কিছুর সাথে মিলে জোড়া গঠন করে) অর্থ, একটিকে অন্যটির অধীন না রেখে দুটোই স্বতন্ত্র, বৈধ প্রয়োগ হিসেবে।
নাহবি পর্যবেক্ষণ — সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৪৯-এ وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ-এর مِن সম্ভবত তাব'ঈদিয়্যাহ (আংশিকতাসূচক) অর্থে ("সৃষ্ট জিনিসগুলোর মধ্য থেকে")। এই পাঠ প্রস্তাবিত মাত্র, অমীমাংসিত — নির্দিষ্ট ই'রাবুল কুরআন গ্রন্থে যাচাই ছাড়া এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করা উচিত নয়।
আল-খতীব আল-কাযউইনী, তালখীসু ফী উলূমিল বালাগাহ, বাব আল-বাদীʿ [খণ্ড/পৃষ্ঠা যাচাই করুন]। طباق-এর দুই উপশ্রেণি: طباق الإيجاب (সরাসরি বিপরীত শব্দ-জোড়া, যেমন "জীবিত-মৃত") ও طباق السلب (একই শব্দের ইতিবাচক-নেতিবাচক রূপ, যেমন "দেখে, দেখে না")।
مقابلة-র কুরআন এ দৃষ্টান্ত: সূরা আল-লাইল ৯২:৫-১০ (দান-তাকওয়া-সত্যায়ন বনাম কৃপণতা-ঔদ্ধত্য-মিথ্যায়ন, ক্রমান্বয়ে) ও সূরা আবাসা ৮০:৩৮-৪২ (উজ্জ্বল মুখমণ্ডল বনাম ধূলিধূসরিত মুখমণ্ডল)।
زوج-আয়াতের বালাগী স্বাতন্ত্র্য — লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ, কোনো ক্লাসিক্যাল বালাগা-গ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি নয়: প্রচলিত طباق/مقابلة-এ বিপরীত পদ দুটি ক্রমান্বয়ে পৃথকভাবে বসে, কিন্তু زوج-আয়াতে বৈপরীত্য একটি একক ছাতা-পরিভাষার মধ্যে প্রোথিত এবং সরাসরি একটি কসমোলজিক্যাল দাবিতে রূপান্তরিত।
ابن عطية الأندلسي বলেন: «والزوج: الصنف» — অর্থাৎ, ‘যাওজ’ (زوج) বলতে ‘প্রকার’ বা ‘শ্রেণি’ বোঝায়। দেখুন: ابن عطية، المحرر الوجيز في تفسير الكتاب العزيز، تفسير سورة يس، الآية ٣٦.
ابن منظور বলেন: «والزوج: الصنف، وكلُّ شيءٍ قُرِنَ بآخر فهو زوج» — অর্থাৎ, ‘যাওজ’ অর্থ ‘প্রকার’ বা ‘শ্রেণি’; আর যে কোনো বস্তু অন্য কিছুর সঙ্গে যুগ্ম হয়, তাকে ‘যাওজ’ বলা হয়। দেখুন: لسان العرب، مادة: (زوج).
الراغب الأصفهاني বলেন: «الزوج كل واحد معه آخر من جنسه أو ما يقارنه» — অর্থাৎ, ‘যাওজ’ হলো এমন প্রত্যেক সত্তা, যার সঙ্গে তার সমজাতীয় বা তার সমান্তরাল আরেকটি সত্তা যুক্ত থাকে। দেখুন: مفردات ألفاظ القرآن، مادة: (زوج).
পরিশিষ্ট ১১: পদার্থবিজ্ঞান (কণা-প্রতিকণা/ভরবেগ সংরক্ষণ) সংক্রান্ত সূত্র
Bruce Cork, Glen R. Lambertson, Oreste Piccioni & William A. Wenzel, "Antineutron," Physical Review 104, no. 4 (1956): 1193–1194. — অ্যান্টিনিউট্রনের প্রথম পরীক্ষামূলক শনাক্তকরণ; চার্জ-নিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও নিউট্রনের একটি স্বতন্ত্র প্রতিকণা রয়েছে।
Owen Chamberlain, Emilio Segrè, Clyde Wiegand & Thomas Ypsilantis, "Observation of Antiprotons," Physical Review 100, no. 3 (1955): 947–950. — অ্যান্টিপ্রোটনের প্রথম আবিষ্কার; পরবর্তীতে অ্যান্টিনিউট্রন সনাক্তকরণের ভিত্তি।
Frederick Reines & Clyde L. Cowan Jr., "The Neutrino," Nature 178 (1956): 446–449. — ইনভার্স বিটা-ক্ষয়ের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর অ্যান্টিনিউট্রিনোর প্রথম পরীক্ষামূলক শনাক্তকরণ।
Clyde L. Cowan Jr., Frederick Reines, Francis B. Harrison, Harold W. Kruse & Austin D. McGuire, "Detection of the Free Neutrino: A Confirmation," Science 124, no. 3212 (1956): 103–104. — মুক্ত অ্যান্টিনিউট্রিনো শনাক্তকরণের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ।
GERDA Collaboration, "Final Results of GERDA on the Search for Neutrinoless Double-Beta Decay," Physical Review Letters 125, no. 25 (2020): 252502. — নিউট্রিনো ডিরাক নাকি মায়োরানা কণা—এই প্রশ্ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি; neutrinoless double-beta decay অনুসন্ধানের সর্বশেষ উচ্চ-নির্ভুলতার ফলাফল।
Anderson, C. D. (1933). The positive electron. Physical Review, 43(6), 491–494. https://doi.org/10.1103/PhysRev.43.491
Cork, B., Lambertson, G. R., Piccioni, O., & Wenzel, W. A. (1956). Antineutrons produced from antiprotons in charge-exchange collisions. Physical Review, 104(4), 1193–1197. https://doi.org/10.1103/PhysRev.104.1193
Dirac, P. A. M. (1928). The quantum theory of the electron. Proceedings of the Royal Society of London, Series A, 117(778), 610–624. https://doi.org/10.1098/rspa.1928.0023
Feynman, R. P., Leighton, R. B., & Sands, M. (1965). The Feynman lectures on physics (Vol. 3, Ch. 18). Addison-Wesley
Introduction to Elementary Particles, ২য় সংস্করণ (২০০৮), অধ্যায়: Quantum Electrodynamics ও Antiparticles — ইলেকট্রন-পজিট্রন অ্যানাইহিলেশন, শক্তি ও ভরবেগ সংরক্ষণ এবং দুই-ফোটন উৎপাদনের আলোচনা।
An Introduction to Quantum Field Theory (১৯৯৫), অধ্যায় ৫ — e+e−→γγ প্রক্রিয়ার কোয়ান্টাম-ইলেকট্রোডায়নামিক বিশ্লেষণ; কেন্দ্র-ভরবেগ কাঠামোতে (center-of-momentum frame) একক ফোটন উৎপাদন ভরবেগ সংরক্ষণ লঙ্ঘন করায় দুই-ফোটন উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা।
Introduction to Electrodynamics, ৪র্থ সংস্করণ (২০১৩), অধ্যায় ১২ — ভরবেগ সংরক্ষণ, তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ এবং ফোটনের জন্য E=pc সম্পর্ক।
Physics in Nuclear Medicine, ৪র্থ সংস্করণ (২০১২), অধ্যায় ৪ — PET স্ক্যানের ভৌত ভিত্তি; ইলেকট্রন-পজিট্রন অ্যানাইহিলেশনের ফলে পরস্পর বিপরীত দিকে নির্গত দুটি ৫১১ keV গামা ফোটন শনাক্ত করে চিত্র নির্মাণের ব্যাখ্যা।
The Feynman Lectures on Physics, Vol. I, অধ্যায় ১৭ ও ১৯ — শক্তি ও ভরবেগ সংরক্ষণ এবং কণা–প্রতিকণা অ্যানাইহিলেশনের মৌলিক আলোচনা।
Paul Dirac, "Quantised Singularities in the Electromagnetic Field," Proceedings of the Royal Society A 133, no. 821 (1931): 60–72. https://doi.org/10.1098/rspa.1931.0130
MoEDAL Collaboration, "Search for Magnetic Monopoles with the MoEDAL Forward Trapping Detector in 2.11 fb⁻¹ of 13 TeV Proton–Proton Collisions at the LHC," Physics Letters B 782 (2018): 510–516. https://doi.org/10.1016/j.physletb.2018.05.069
Otto Stern; Walther Gerlach, "Der experimentelle Nachweis der Richtungsquantelung im Magnetfeld," Zeitschrift für Physik 9 (1922): 349–352. https://doi.org/10.1007/BF01326983
Paul Dirac, "The Quantum Theory of the Electron," Proceedings of the Royal Society A 117, no. 778 (1928): 610–624. https://doi.org/10.1098/rspa.1928.0023
Carl D. Anderson, "The Positive Electron," Physical Review 43, no. 6 (1933): 491–494. https://doi.org/10.1103/PhysRev.43.491
Emmy Noether, "Invariante Variationsprobleme," Nachrichten von der Gesellschaft der Wissenschaften zu Göttingen, Mathematisch-Physikalische Klasse (1918): 235–257.
পরিশিষ্ট ১২: জীববিজ্ঞান (লিঙ্গ-নির্ধারণ, পার্থেনোজেনেসিস ইত্যাদি) সংক্রান্ত সূত্র
Bloomfield, G., Skelton, J., Ivens, A., Tanaka, Y., & Kay, R. R. (2010). Sex determination in the social amoeba Dictyostelium discoideum. Science, 330(6010), 1533–1536. https://doi.org/10.1126/science.1197423
Douglas, T. E., Strassmann, J. E., & Queller, D. C. (2016). Sex ratio and gamete size across eastern North America in Dictyostelium discoideum, a social amoeba with three sexes. Journal of Evolutionary Biology, 29(7), 1298–1306. https://doi.org/10.1111/jeb.12871
Erdos, G. W., Raper, K. B., & Vogen, L. K. (1973). Mating types and macrocyst formation in Dictyostelium discoideum. Proceedings of the National Academy of Sciences, 70(6), 1828–1830. https://doi.org/10.1073/pnas.70.6.1828
Molecular Mechanisms of Sex Determination in Flowering Plants: https://www.nature.com/nature-index/topics/l4/molecular-mechanisms-of-sex-determination-in-flowering-plants
Integrative control of plant sex determination: Genes, hormones, and environment: https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S0168945225004182
Kothe, E. (1996). Tetrapolar fungal mating types: Sexes by the thousands. FEMS Microbiology Reviews, 18(1), 65–87. https://doi.org/10.1111/j.1574-6976.1996.tb00227.x
Volk, T. J. (2000, February). Schizophyllum commune, the split gill fungus [Tom Volk's Fungus of the Month]. University of Wisconsin. https://botit.botany.wisc.edu/toms_fungi/feb2000.html
Joseph Heitman, "Sex in Fungi: Molecular Determination and Evolutionary Implications," Cold Spring Harbor Perspectives in Biology 7, no. 5 (2015): a019052।
J. W. Taylor, D. J. Jacobson & M. C. Fisher, "The Evolution of Asexual Fungi: Reproduction, Speciation and Classification," Annual Review of Phytopathology 37 (1999): 197–246।
Arthur Ghiselin, "The Economy of Nature and the Evolution of Sex," University of California Press (1969); এছাড়াও Eric R. Kandel, "The Functional Organization of the Gill Withdrawal Reflex in Aplysia," Journal of Physiology (Paris) 66 (1973): 375–391। (Aplysia একটি simultaneous hermaphrodite এবং পুরুষ ও স্ত্রী উভয় প্রজনন-তন্ত্র বহন করে।)
J. L. Leonard, "Sexual Conflict in Simultaneous Hermaphrodites: Evidence from Animals and Plants," Integrative and Comparative Biology 46, no. 4 (2006): 349–361. (Simultaneous hermaphrodites-এ একই ব্যক্তির মধ্যে উভয় প্রজনন ভূমিকার আলোচনা।)
N. K. Michiels, "Mating Conflicts and Sperm Competition in Simultaneous Hermaphrodites," Proceedings of the Royal Society B 265 (1998): 689–695. (Simultaneous hermaphrodites-এ শুক্রাণু দান ও গ্রহণের পৃথক ভূমিকা এবং মিলন কৌশল।)
John Pearse, "Reproductive Behavior of Aplysia," Veliger 15 (1972): 281–286. (Aplysia-র বিখ্যাত mating chain আচরণের বর্ণনা।)
F. C. Kuhl, "Reproduction and Development in Chaetognatha," Biological Bulletin 141 (1971): 460–475. (Chaetognatha-এ পুরুষ ও স্ত্রী জনন-অঙ্গের অবস্থান এবং প্রধানত cross-fertilization-এর আলোচনা।)
Charles J. Cole, Herndon G. Dessauer, et al., "Unisexual lizards of the genus Cnemidophorus (Teiidae) in the southwestern United States and northern Mexico: origins and relationships," American Museum Novitates 2900 (1988): 1–38। — New Mexico whiptail যে দুটি যৌন-প্রজননকারী পূর্বপুরুষ প্রজাতির সংকরায়নের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে, তার প্রমাণ।
A. K. Persons et al., "Hybridization, sex and the origin of parthenogenetic whiptail lizards," Evolution 75 (2021)। — Aspidoscelis গণের একলিঙ্গ (parthenogenetic) প্রজাতিগুলোর হাইব্রিড উৎপত্তি ও উৎপত্তি।
Ho et al., "Chromosome-level genome assembly of the parthenogenetic New Mexico whiptail (Aspidoscelis neomexicanus)," Genome Biology and Evolution (2025)। — ক্রোমোজোম-স্তরের জিনোম বিশ্লেষণে হাইব্রিড উৎপত্তি, heterozygosity এবং জিনোম সংরক্ষণ।
David Crews, "Induction of pseudosexual behavior in parthenogenetic lizards," Nature 319 (1986): 435–438। — parthenogenetic whiptail lizard-এ হরমোন-নিয়ন্ত্রিত male-like mounting behavior (pseudocopulation) এবং এর প্রজননগত গুরুত্ব।
David Crews & Kimberly K. Moore, "Parthenogenesis and pseudosexual behavior in whiptail lizards," Hormones and Behavior 19 (1985): 50–65। — ventral mounting behavior, ovarian cycle এবং ডিম উৎপাদনের সঙ্গে আচরণগত সম্পর্ক।
Phillip C. Watts, Kevin R. Buley, Richard Sanderson, Wayne Boardman, Claudio Ciofi & Richard Gibson, "Parthenogenesis in Komodo dragons," Nature 444 (2006): 1021–1022। — কোমোডো ড্রাগনে facultative parthenogenesis, ZW লিঙ্গ-নির্ধারণ ব্যবস্থা এবং পার্থেনোজেনেসিসে কার্যকর ZZ (পুরুষ) সন্তানের উৎপত্তির প্রমাণ।
Demian D. Chapman, Mahmood S. Shivji, Ed D. Louis Jr., et al., "Virgin Birth in a Hammerhead Shark," Biology Letters 3 (2007): 425–427। — হাঙরে facultative parthenogenesis-এর প্রথম জিনগতভাবে নিশ্চিত প্রমাণ।
Jessica G. Booth, David P. Mindell & Warren Booth, "Facultative parthenogenesis discovered in wild vertebrates," Biology Letters 8 (2012): 983–985। — বন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীতে facultative parthenogenesis-এর প্রমাণ এবং এর উৎপত্তিগত তাৎপর্য।
Anna Bast, et al., "Meiosis in Parthenogenetic Animals," Chromosome Research 26 (2018): 315–324। — বিভিন্ন পার্থেনোজেনেটিক প্রাণীতে diploidy পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া (যেমন automixis, premeiotic genome duplication ইত্যাদি) এবং মিয়োসিসের বৈচিত্র্য।
পরিশিষ্ট ১৩: ফিকহ সংক্রান্ত সূত্র
ابن قدامة، المغني، كتاب الفرائض، باب ميراث الخنثى
الكاساني، بدائع الصنائع، كتاب الفرائض، باب ميراث الخنثى
النووي، روضة الطالبين، كتاب الفرائض
পরিশিষ্ট ১৪: পরিসংখ্যানগত পরিভাষা সূত্র
পরিশিষ্ট ১৫: অনলাইন তাফসীর সূত্র
IslamQA. (n.d.). Meaning of "We have created of everything a pair" (Fatwa No. 223457). https://islamqa.info/en/answers/223457/
Tafsir.app. (n.d.). Comparative tafsir readings: Surah 13:3, 36:36, 43:12, 51:49. https://tafsir.app/
মন্তব্য