
সারসংক্ষেপ
রজমের (পাথর মেরে হত্যার) শাস্তি ইসলামি ফিকহের অন্যতম বহুল আলোচিত বিষয়। আধুনিক সংস্কারবাদীরা দাবি করেন যে রজম কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ সূরা নূর ২ নং আয়াতে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে কেবল একশত বেত্রাঘাতের কথা উল্লেখ আছে। এই প্রবন্ধে আরবি ভাষাতত্ত্ব, উসুলুল ফিকহ, সাহাবাদের ঐতিহাসিক ইজমা এবং ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে সংস্কারবাদীদের দাবি ভাষাগত, ঐতিহাসিক ও পদ্ধতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
১. ভূমিকা
রজমের বিধান ইসলামি আইনের ইতিহাসে সর্বদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে বিশেষত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মুসলিম স্কলার এই বিধানকে কুরআনবিরোধী বলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এ বিতর্কটি মূলত তিনটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়:
সূরা নূর ২ নং আয়াতের ভাষাতাত্ত্বিক পরিসর কতটুকু?
হাদিস কি কুরআনের বিধানকে বিশেষায়িত (তাখসিস) করতে পারে?
সাহাবাদের ইজমা ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে তার মর্যাদা কী?
এই প্রবন্ধে উক্ত তিনটি প্রশ্নের একাডেমিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
২. কুরআনের আয়াতের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
২.১ সূরা নূর, আয়াত ২
اَلزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ
"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী — তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো।" (সূরা নূর: ২)
২.২ মূল আরবি শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
আরবি শব্দ
বাংলা অর্থ
ব্যাকরণিক বিভাগ
পরিসর
الزَّانِيَةُ
ব্যভিচারিণী
নির্দিষ্ট বিশেষ্য (আল সহ)
সকল ব্যভিচারিণী
الزَّانِي
ব্যভিচারী
নির্দিষ্ট বিশেষ্য (আল সহ)
সকল ব্যভিচারী
كُلَّ وَاحِدٍ
প্রত্যেককে
সর্বসমেত বিশেষণ
কোনো ব্যতিক্রম নেই
مِائَةَ جَلْدَةٍ
একশত বেত্রাঘাত
সংখ্যাবাচক বিশেষ্য
নির্দিষ্ট সংখ্যা
২.৩ আল-ইসতিগরাক: আরবি ভাষার সাধারণীকরণ নীতি
আরবি ব্যাকরণে 'আল' (ال) যুক্ত বিশেষ্য দুই ধরনের হয়: (১) আল-আহদিয়্যা — নির্দিষ্ট কাউকে বোঝায়, এবং (২) আল-ইসতিগরাক — সমগ্র শ্রেণিকে বোঝায়। সূরা নূর ২-তে 'আল-জানিয়াহ' ও 'আল-জানি' শব্দদ্বয়ে 'আল' ব্যবহৃত হয়েছে ইসতিগরাক অর্থে, অর্থাৎ সকল ব্যভিচারী — বিবাহিত বা অবিবাহিত যাই হোক।
ইমাম সিবাওয়াইহি (মৃ. ১৭৭ হি.) তাঁর 'আল-কিতাব'-এ এই নিয়ম সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম আল-জারজানি 'দালাইলুল ই'জায'-এ একইভাবে বলেছেন যে এ ধরনের 'আল' সমগ্র শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
উপসংহার: ভাষাতাত্ত্বিকভাবে আয়াতটি সার্বজনীন। এতে বিবাহিত-অবিবাহিত কোনো পার্থক্য নেই।
৩. তাখসিস: হাদিস দ্বারা কুরআনের বিধান বিশেষায়িত করা
৩.১ তাখসিস কী?
উসুলুল ফিকহের পরিভাষায় তাখসিস (التخصيص) হলো কোনো সাধারণ বিধানকে বিশেষ দলিলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা। এটি ইসলামি আইনের একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি।
৩.২ হাদিস দ্বারা তাখসিসের উদাহরণ
কুরআনে অনেক বিধান সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে যা হাদিস দ্বারা বিশেষায়িত হয়েছে। উদাহরণ:
কুরআনের সাধারণ বিধান
হাদিসের বিশেষায়ন
উৎস
নামাজ কায়েম করো
প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত, নির্দিষ্ট রাকাতে
বুখারি, মুসলিম
যাকাত দাও
নিসাব পরিমাণ সম্পদে, ২.৫% হারে
আবু দাউদ, তিরমিজি
ব্যভিচারীকে শাস্তি দাও (নূর:২)
বিবাহিতের জন্য রজম
বুখারি, মুসলিম
উত্তরাধিকার দাও (নিসা:১১)
হত্যাকারী পাবে না
তিরমিজি
ইমাম আল-আমিদি (মৃ. ৬৩১ হি.) তাঁর 'আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম'-এ বলেছেন: হাদিসে মুতাওয়াতির বা মশহুর পর্যায়ের হাদিস দ্বারা কুরআনের আম বিধানের তাখসিস করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি চার মাযহাবের সর্বসম্মত অবস্থান।
৪. রজমের হাদিস: প্রামাণিকতা ও ব্যাপকতা
৪.১ সহিহ হাদিস থেকে রজমের প্রমাণ
রজমের বিধান সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম সহ প্রধান হাদিস গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন সাহাবা থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিস গ্রন্থ
বর্ণনাকারী সাহাবি
ঘটনা
রেফারেন্স
সহিহ বুখারি
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)
রজমের বিধান ঘোষণা ও বাস্তবায়ন
কিতাবুল হুদুদ, ৬৮২৯
সহিহ মুসলিম
আবু হুরায়রা ও জায়েদ ইবন খালিদ (রা.)
ব্যভিচারীকে রজম
কিতাবুল হুদুদ, ১৬৯৮
সহিহ বুখারি
জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.)
মাইয যামির ঘটনা
কিতাবুল হুদুদ, ৬৮১৪
সুনান আবু দাউদ
ইবন আব্বাস (রা.)
নবী (সা.)-এর রজম কার্যকর
কিতাবুল হুদুদ, ৪৪২৬
সহিহ মুসলিম
বুরাইদা (রা.)
গামিদিয়্যা নারীর রজম
কিতাবুল হুদুদ, ১৬৯৫
৪.২ উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ
"আল্লাহর কসম, যদি মানুষ না বলত যে উমর আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু যোগ করেছে যা তাতে নেই, তাহলে আমি রজমের আয়াত লিখে দিতাম। কারণ আমরা তা পাঠ করেছি। আল্লাহর রাসূল (সা.) রজম কার্যকর করেছেন, আমরাও করেছি।"
— উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), সহিহ বুখারি, কিতাবুল হুদুদ, হাদিস ৬৮২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৯১
৫. সাহাবাদের ইজমা ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব
৫.১ ইজমা কী এবং এর মর্যাদা কতটুকু?
ইজমা (الإجماع) হলো কোনো যুগের মুজতাহিদ আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্য। উসুলুল ফিকহের দৃষ্টিতে ইজমা হলো কুরআন ও সুন্নাহর পরে ইসলামি আইনের তৃতীয় সর্বোচ্চ দলিল।
ইমাম আল-শাফিঈ (মৃ. ২০৪ হি.) তাঁর 'আর-রিসালা'-য় বলেছেন: সাহাবাদের ইজমা শরিয়তের অকাট্য দলিল, কারণ তারা নবী (সা.)-এর সরাসরি শিষ্য ছিলেন এবং কুরআনের ব্যাখ্যা সরাসরি তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন।
৫.২ রজমের প্রশ্নে সাহাবাদের অবস্থান
সাহাবি
অবস্থান ও কার্যক্রম
উৎস
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)
খলিফা হিসেবে রজম কার্যকর করেছেন, মিম্বরে ঘোষণা দিয়েছেন
বুখারি ৬৮২৯, মুসলিম ১৬৯১
আলী ইবন আবি তালিব (রা.)
রজম কার্যকর করেছেন এবং বেত্রাঘাতের বিধানটি অবিবাহিতের জন্য বলেছেন
বুখারি ৬৮১২
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)
রজমকে সুন্নাতে মুতাওয়াতিরা বলেছেন
মুসান্নাফ ইবন আবি শায়বা
আবু হুরায়রা (রা.)
রজমের হাদিস বর্ণনা করেছেন
মুসলিম ১৬৯৮
ইবন আব্বাস (রা.)
রজমের বিধান বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন
আবু দাউদ ৪৪১৫
গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: একজনও সাহাবি রজমের বিরোধিতা করেননি। এটি ইজমা আস-সাহাবা — সাহাবাদের সর্বসম্মত ঐকমত্য।
৬. ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব: কে বেশি বুঝবেন?
৬.১ ইসলামি জ্ঞানের উৎসক্রম
ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে কুরআন বোঝার ক্রম নির্ধারিত আছে:
স্তর
উৎস
মর্যাদা
১ম
কুরআন নিজে (কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন দিয়ে)
সর্বোচ্চ
২য়
নবী (সা.)-এর ব্যাখ্যা ও আমল (হাদিস)
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
৩য়
সাহাবাদের সম্মিলিত বোঝাপড়া (ইজমা)
তৃতীয় সর্বোচ্চ
৪র্থ
তাবেঈন ও পরবর্তী মুজতাহিদদের ব্যাখ্যা
চতুর্থ
৫ম
আধুনিক স্কলারদের ব্যক্তিগত মত
সবচেয়ে নিচে
৬.২ সাহাবারা কেন বেশি বুঝবেন?
তারা ছিলেন নেটিভ আরব — কুরআনের ভাষা তাদের মাতৃভাষা
তারা নবী (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি তাফসির শুনেছেন
আয়াতের নুযুলের (অবতরণের) প্রেক্ষাপট তারা চোখে দেখেছেন
কুরআনের ভাষাগত সূক্ষ্মতা তারা স্বভাবগতভাবেই বুঝতেন
ইমাম মালিক (মৃ. ১৭৯ হি.) বলেছেন: যে সাহাবাদের বিরুদ্ধে মত দেয়, সে বিপথগামী। (আল-মুওয়াত্তা, ভূমিকা)
৬.৩ সংস্কারবাদীদের পদ্ধতিগত সমস্যা
আধুনিক সংস্কারবাদীরা মূলত দাবি করছেন: "আমরা ১৪০০ বছর পরে, ভিন্ন ভাষায়, বইয়ের মাধ্যমে শিখে সাহাবাদের চেয়ে কুরআন ভালো বুঝতে পারি।" ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে এটি একটি অযৌক্তিক দাবি।
ইমাম ইবন তাইমিয়া (মৃ. ৭২৮ হি.) তাঁর 'মাজমুউল ফাতাওয়া'-তে বলেছেন: যে ব্যক্তি সাহাবাদের বোঝাপড়ার বিরুদ্ধে কুরআনের ব্যাখ্যা করে, সে মূলত নিজের মতকে ওহির উপরে স্থান দিচ্ছে।
৭. সংস্কারবাদী যুক্তিগুলোর মূল্যায়ন
সংস্কারবাদী যুক্তি
একাডেমিক খণ্ডন
কুরআনে রজমের কথা নেই, তাই বৈধ নয়।
কুরআনে নামাজের রাকাত, যাকাতের নিসাবও নেই — এগুলোও কি অবৈধ? হাদিস কুরআনের সম্পূরক।
সূরা নূর:২ সকলের জন্য প্রযোজ্য।
ঠিকই আছে — কিন্তু এটি প্রমাণ করে রজম কুরআনবিরোধী নয়, বরং হাদিস অতিরিক্ত বিধান দিয়েছে।
রজমের আয়াত কুরআনে ছিল না।
উমর (রা.) ও একাধিক সাহাবি বলেছেন তারা তা পাঠ করেছেন (নাসখুত তিলাওয়া)।
মানবাধিকারের দৃষ্টিতে রজম অগ্রহণযোগ্য।
এটি ধর্মতাত্ত্বিক নয়, রাজনৈতিক যুক্তি। ইসলামের বিধান যুগের মানদণ্ডে নয়, ওহির ভিত্তিতে নির্ধারিত।
৮. উপসংহার
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে:
ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সূরা নূর ২ নং আয়াত শুধু অবিবাহিতদের জন্য নয়, সকলের জন্য প্রযোজ্য — এটি সংস্কারবাদীদের দাবিকে দুর্বল করে, শক্তিশালী করে না।
হাদিস দ্বারা কুরআনের আম বিধানের তাখসিস করা উসুলুল ফিকহে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি।
সাহাবাদের সর্বসম্মত ইজমা রজমের পক্ষে — যা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে অকাট্য দলিল।
আধুনিক সংস্কারবাদীরা ইসলামি জ্ঞানের ক্রমশ্রেণি অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত যুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন — যা পদ্ধতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
রজমকে কুরআনবিরোধী বলার কোনো ভাষাগত, ঐতিহাসিক বা পদ্ধতিগত ভিত্তি নেই। এটি একটি আধুনিক সংস্কারবাদী অবস্থান যা ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
প্রাথমিক উৎস (Primary Sources)
আল-বুখারি, মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল। সহিহ আল-বুখারি। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ৬৮২৯, ৬৮১২, ৬৮১৪।
মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ। সহিহ মুসলিম। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ১৬৯০-১৬৯৮।
আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি। সুনান আবু দাউদ। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ৪৪১৫-৪৪২৮।
আত-তিরমিজি, মুহাম্মদ ইবন ঈসা। সুনান আত-তিরমিজি। কিতাবুল হুদুদ।
উসুলুল ফিকহ (Islamic Jurisprudence)
আল-শাফিঈ, মুহাম্মদ ইবন ইদ্রিস (মৃ. ২০৪ হি.)। আর-রিসালা। তাহকিক: আহমাদ মুহাম্মদ শাকির। কায়রো: মাকতাবাতুল হালাবি।
আল-আমিদি, সাইফুদ্দিন (মৃ. ৬৩১ হি.)। আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম। বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি।
ইবন তাইমিয়া, আহমাদ (মৃ. ৭২৮ হি.)। মাজমুউল ফাতাওয়া। রিয়াদ: মাজমাউ মালাকি।
ইবন কুদামা, মুওয়াফফাকুদ্দিন (মৃ. ৬২০ হি.)। আল-মুগনি। বৈরুত: দারুল ফিকর।
আরবি ভাষাতত্ত্ব (Arabic Linguistics)
সিবাওয়াইহি, আমর ইবন উসমান (মৃ. ১৭৭ হি.)। আল-কিতাব। তাহকিক: আবদুস সালাম হারুন। কায়রো: মাকতাবাতুল খানজি।
আল-জারজানি, আবদুল কাহির (মৃ. ৪৭১ হি.)। দালাইলুল ই'জায। বৈরুত: দারুল মারিফা।
আধুনিক গবেষণা (Modern Academic Works)
Peters, Rudolph. Crime and Punishment in Islamic Law. Cambridge: Cambridge University Press, 2005.
Hallaq, Wael B. A History of Islamic Legal Theories. Cambridge: Cambridge University Press, 1997.
Kamali, Mohammad Hashim. Principles of Islamic Jurisprudence. Cambridge: Islamic Texts Society, 2003.
মন্তব্য