Are you sure?

হাদিস »  তাহকীক হাদিস »  ফিকহ হাদিস »  নৈতিকতা ও আদর্শ

কুমারী বিয়ের হাদিসে 'যোনীপথ উষ্ণ' মিথ্যা সংযোজন — ক্লাসিক্যাল মুহাদ্দিসদের বিস্তারিত রায় ও একাডেমিক বিশ্লেষণ

সূচি:

১. ভূমিকা: অভিযোগের স্বরূপ

২. হাদিসটির পরিচয় ও দুটি রেওয়ায়েত

৩. মূল বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলামের উপর ইমামদের রায় — জারহ ও তাদিল

৪. হাদিসশাস্ত্রের কিছু প্রয়োজনীয় পরিভাষা

৫. মূল হাদিসের সনদ নিয়ে ইমামদের রায়

৬. অনুবাদের ভুল সংশোধন — وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا পদের সঠিক অর্থ

৭. উপসংহার

ভূমিকা:

ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশ হাদিসের ভুল অনুবাদ ও সনদ-বিশ্লেষণের অজ্ঞতার উপর নির্মিত। সমালোচকরা প্রায়ই কোনো হাদিসের দুর্বল বা একক বর্ণনাকে মূল হাদিসের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন, কিংবা আরবি শব্দের অর্থ না বুঝেই আপত্তিজনক অনুবাদ তৈরি করেন। এরপর সেই ভুল অনুবাদকেই ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

এই প্রবন্ধে আলোচিত অভিযোগটি ঠিক এই ধরনেরই একটি উদাহরণ। অভিযোগকারীরা দাবি করেন যে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কুমারী বিয়ের পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন যে তাদের "যোনীপথ অধিক উষ্ণ।" এই দাবিটি ইন্টারনেটে ও বিভিন্ন ইসলামবিরোধী প্রকাশনায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং অনেক সাধারণ মুসলিম পাঠক এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন।

বাস্তবে এই অভিযোগটি দুটি স্বতন্ত্র সমস্যার উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম সমস্যাটি সনদগত — যে বাড়তি শব্দাংশ থেকে এই আপত্তির উৎপত্তি, সেটি হাদিসশাস্ত্রের মানদণ্ডে একটি প্রত্যাখ্যাত সংযোজন মাত্র, যার রাবিকে যুগে যুগে মুহাদ্দিসরা সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল বলেছেন এবং যার পক্ষে কোনো শাহেদ নেই। দ্বিতীয় সমস্যাটি ভাষাগত — মূল হাদিসে থাকা وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا পদটির অর্থ "যোনীপথ উষ্ণ" নয়, বরং "অধিক সন্তানধারিণী," যা আরবি অভিধানশাস্ত্র ও হাদিসের শারিহদের ব্যাখ্যা থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত।

এই প্রবন্ধে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল থেকে শুরু করে ইবন হাজার আল-আসকালানী, শায়খ আলবানী ও শায়খ আরনাউত পর্যন্ত প্রথম সারির মুহাদ্দিসদের রায়ের আলোকে অভিযোগটির সনদগত ও ভাষাগত উভয় দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই — বিভ্রান্তি দূর করে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

হাদিসটির পরিচয় ও দুটি রেওয়ায়েত:
আলোচ্য হাদিসটি একাধিক সনদে বর্ণিত এবং এর ভাষায় কিছু তারতম্য রয়েছে। শায়খ শু‘আইব আল-আরনাউত (রহ.) তাঁর তাহকিককৃত সুনান ইবন মাজাহতে হাদীসটির মূল সনদকে দুর্বল (যঈফ) বলেছেন। কারণ এতে আবদুর রহমান ইবন সালিম ও তাঁর পিতার পরিচয় অজ্ঞাত (مجهول) হওয়ায় সনদে দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সনদগুলোও পৃথকভাবে বিভিন্ন রাবির দুর্বলতার কারণে ত্রুটিযুক্ত। তবে শায়খ আলবানী (রহ.) সিলসিলাতুস সহীহাহতে উল্লেখ করেছেন যে, এককভাবে সব সনদই দুর্বল হলেও একাধিক দুর্বল সনদ পরস্পরকে শক্তিশালী করায় হাদীসটিকে হাসান লি-গাইরিহি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে তবে  কিন্তু হাদিসটির "যোনীপথ অধিক উষ্ণ" অংশটি নির্দিষ্টভাবে যইফ, কেননা একে সমর্থন দেয়ার মত কোনো শাহেদ নেই , এবিষয়েই আমাদের মূল আলোচনা  ।

হাদীসটির  প্রধান দুটি রেওয়ায়েত:

প্রথম রেওয়ায়েত — যেটি ইবন মাজাহতে সংকলিত:

قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ
তোমরা কুমারী বিয়ে কর। কেননা তারা মিষ্টমুখী, অধিক সন্তানধারিণী এবং অল্পতে সন্তুষ্ট।1,2
শব্দে শব্দে অর্থ:

لله عليه وسلم = রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ = তোমাদের জন্য কুমারী নারীদের (বিবাহ করা) উচিত / তোমরা কুমারীদের গ্রহণ করো
فَإِنَّهُنَّ = কারণ নিশ্চয়ই তারা
أَعْذَبُ أَفْوَاهًا = অধিক মধুরভাষী / মুখের কথা অধিক মিষ্টি
وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا = অধিক উর্বর গর্ভের অধিকারিণী / সন্তানধারণে বেশি সক্ষম
وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ = অল্পতেই বেশি সন্তুষ্ট


দ্বিতীয় রেওয়ায়েত — যেটিতে বিতর্কিত অংশটি আছে:ر
 

عَلَيْكُمْ بِالأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهاً وَأَنْتَقُ أَرْحَاماً   وَأَسْخَنُ أَقْبَالاً  وَأَرْضَى بِالْيَسِي
বাংলা অনুবাদ:

“তোমরা কুমারী (অবিবাহিতা) নারীদেরকে (বিবাহের জন্য) গ্রহণ করো; কারণ তারা কথাবার্তায় অধিক মধুর, সন্তানধারণে অধিক সক্ষম, দাম্পত্যে বেশি অনুরাগী এবং অল্পতেই বেশি সন্তুষ্ট থাকে।”

শব্দগত অর্থ:

عَلَيْكُمْ بِالأَبْكَارِ = তোমরা কুমারীদের (বিবাহে) গ্রহণ করো
فَإِنَّهُنَّ = কারণ নিশ্চয়ই তারা
أَعْذَبُ أَفْوَاهًا = অধিক মধুরভাষী / মুখের কথা মিষ্টি
وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا = অধিক উর্বর গর্ভের অধিকারিণী / সন্তানধারণে বেশি সক্ষম
وَأَسْخَنُ أَقْبَالًا = স্বামীর প্রতি অধিক আগ্রহী, সানন্দে গ্রহণকারী, দাম্পত্যে বেশি অনুরাগী
وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ = অল্পতেই বেশি সন্তুষ্ট


*** চিহ্নিত وَأَسْخَنُ أَقْبَالاً ("যোনীপথ অধিক উষ্ণ" অনেকেই অনুবাদ করেছেন এবং এটিই মূল সমালোচনার কারণ  ) অংশটি কেবল এই একটি বর্ণনায় আছে — ইবনুস সুন্নি ও আবু নুয়াইমের রেওয়ায়েতে। যদিও "যোনীপথ অধিক উষ্ণ" অনুবাদটি উপযুক্ত নয়  এ বিষয়ে পরে আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ । এর বর্ণনাকারী মূল সূত্র: আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম  ***

মূল বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলামের উপর ইমামদের রায় — জারহ ও তাদিল:
"যোনীপথ উষ্ণ" অংশটি বহনকারী একমাত্র সনদের কেন্দ্রীয় রাবি হলেন আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম আল-আদাবী (মৃত্যু ১৮২ হি.)। তার সম্পর্কে হাদিসশাস্ত্রের প্রথম সারির ইমামরা কী বলেছেন:

বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম আল-আদাওয়ী (মৃ. ১৮২ হি.) হলেন মদিনার রাবি এবং তিনি  হাদিসশাস্ত্রে সকল ইমামের মতে যঈফ । তার সম্পর্কে কয়েকজন ইমামের মূল্যায়ন উল্লেখ করা হলো :

ইমামের নাম: অভিমত: তথ্য সূত্র:
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃ. ২৪১ হি.) "ضعيف" (দুর্বল) — তিনি এই রাবিকে স্পষ্টভাবে দুর্বল বলেছেন এবং তার বর্ণনা করা একটি হাদিসকে "মুনকার" (প্রত্যাখ্যাত) আখ্যা দিয়েছেন। তাহযিবুল কামাল, আল-মিযযী, ১৭/১১৪; জারহ ওয়া তাদিল, ইবন আবি হাতিম, ৫/২৩৩
ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈন (মৃ. ২৩৩ হি.) "ليس حديثه بشيء، ضعيف" — "তার হাদিস কোনো মূল্যই নেই, সে দুর্বল।" জারহ ওয়া তাদিল, ইবন আবি হাতিম, ৫/২৩৩; আল-কামিল ফিয যুআফা, ইবন আদি, ৫/৪৪১
ইমাম আলি ইবনুল মাদিনী (মৃ. ২৩৪ হি.) "ضعفه علي جداً" — "আলি (ইবনুল মাদিনী) তাকে অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন।" তিনি আরও বলেন: "যায়দ বিন আসলামের সন্তানদের মধ্যে কেউই নির্ভরযোগ্য নয়।" তাহযিবুল কামাল, ১৭/১১৭; আল-কামিল ফিয যুআফা, ৫/৪৪১
ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (মৃ. ২৭৫ হি.) "أولاد زيد بن أسلم كلهم ضعيف" — "যায়দ বিন আসলামের সকল সনদই দুর্বল।" তাহযিবুল কামাল, ১৭/১১৪–১১৫
ইমাম আন-নাসাই (মৃ. ৩০৩ হি.) "ضعيف" — স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে দুর্বল বলেছেন। তাহযিবুল কামাল, ১৭/১১৫
ইমাম আল-বুখারী (মৃ. ২৫৬ হি.) "ضعفه علي جداً" — আলি ইবনুল মাদিনীর সূত্রে তাকে অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন। তাহযিবুল কামাল, ১৭/১১৭
ইমাম আবু যুরআহ আর-রাযী (মৃ. ২৬৪ হি.) "ضعيف" — দুর্বল। আল-কামিল ফিয যুআফা, ইবন আদি, ৫/৪৪১
ইমাম ইবন আদি (মৃ. ৩৬৫ হি.) "أسامة وعبد الرحمن متقاربان ضعيفان" — "আসামা ও আব্দুর রহমান উভয়েই সমানভাবে দুর্বল।" আল-কামিল ফিয যুআফা, ৫/৪৪১
ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হি.) তাঁর রচিত  তাহযিবুত তাহযিব এ এই রাবির দুর্বলতার বিষয়ে পূর্বতন সকল ইমামের মতামত সংকলন করে নিশ্চিত করেছেন যে সে যঈফ। তাহযিবুত তাহযিব, ২/৫০৭; তাহযিবুল কামাল, আল-মিযযী, ১৭/১১৪–১১৮


কিছু পরিভাষা:  
এপর্যায়ে আলোচনা সামনে আগানোর আগে হাদীস শাস্ত্রের কিছু পরিভাষা সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরী : 

জারহ ও তাদিল (الجرح والتعديل):
রাবিদের (বর্ণনাকারীদের) বিশ্বাসযোগ্যতা বা অবিশ্বাসযোগ্যতা নির্ণয়ের বিজ্ঞান। জারহ = রাবিকে দুর্বল বলা, তাদিল = নির্ভরযোগ্য বলা।

ইসনাদ (إسناد):
হাদিস বর্ণনাকারীদের পরম্পরাবদ্ধ শৃঙ্খল। হাদিসশাস্ত্রে এটি মূল মান নির্ণয়ের হাতিয়ার।

মাতন (متن):
হাদিসের মূল পাঠ্য বা বিষয়বস্তু। মাতন-সমালোচনা হলো বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে হাদিসের যাচাই।

যিয়াদাহ (زيادة):
হাদিসের একটি বর্ণনায় এমন অতিরিক্ত অংশ যা অন্য সনদে পাওয়া যায় না। এই অতিরিক্ত অংশ গ্রহণযোগ্য হতে শাহেদ প্রয়োজন।

শাহেদ (شاهد):
ভিন্ন সাহাবী সূত্রে একই বিষয়ে আসা সমর্থনকারী বর্ণনা। শাহেদ না থাকলে যিয়াদাহ গ্রহণযোগ্য হয় না।

হাসান লি গাইরিহ (حسن لغيره):
মূলত যঈফ হাদিস যা একাধিক বিভিন্ন সনদের কারণে হাসান পর্যায়ে উন্নীত হয়। তবে এই উন্নতি কেবল সেই অংশের জন্য প্রযোজ্য যার জন্য শাহেদ আছে।

এখন পুনরায় আলোচ্য হাদীসের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক , 

মূল হাদিসের সনদ নিয়ে ইমামদের রায়: 
শুধু যিয়াদাহর রাবি নয়, বরং আলচ্য মূল হাদিসটির প্রধান সনদে থাকা রাবিদের বিষয়েও শীর্ষ ইমামরা মন্তব্য করেছেন যা নিচে উল্লেখ করা হলো :


শায়খ শুয়াইব আল-আরনাওত (রহ.) (মৃ. ২০১৬ খ্রি.): 
সুনান ইবন মাজাহর সর্বাধুনিক ও সর্বনির্ভরযোগ্য তাহকিককারীর  হাদীসটির  তাহকিক - 
"إسناده ضعيف لجهالة عبد الرحمن بن سالم بن عتبة بن عويم بن ساعدة وجهالة أبيه" — "সনদটি দুর্বল, কারণ আব্দুর রহমান বিন সালিম ও তার পিতা উভয়ের পরিচয় অজ্ঞাত।"3


হাফিজ ইবন হাজার আল-আসকালানী (রহ.) (৭৭৩–৮৫২ হি.)
শাফিঈ মাযহাবের শীর্ষ মুহাদ্দিস, ফাতহুল বারী ও তাহযিবুত তাহযিবের রচয়িতা প্রথমত: আত-তালখিসুল হাবির (৫/২২৩৯)-এ "যোনীপথ উষ্ণ" অংশটিকে হাদিসের মাতনে একটি বিচ্ছিন্ন যিয়াদাহ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এর জন্য কোনো শাহেদ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।4 দ্বিতীয়ত: তাহযিবুত তাহযিব (২/৫০৭)-এ আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম (এই যিয়াদাহর একমাত্র রাবি)-এর দুর্বলতার বিষয়ে সকল পূর্বতন ইমামের ঐকমত্য সংকলন করেছেন।5

ইমাম আল-মিযযী (রহ.) (৬৫৪–৭৪২ হি.):
তাহযিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজালের রচয়িতা, রাবি-জীবনীশাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম  তাহযিবুল কামাল (১৭/১১৪–১১৮)-এ আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলামের সম্পূর্ণ জীবনী সংকলন করেছেন। সেখানে ইমাম আহমদ, ইয়াহইয়া বিন মাঈন, ইবনুল মাদিনী, নাসাই সহ সকলের জারহ একত্র করে প্রমাণ করেছেন এই রাবি সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল।6

ইমাম ইবন আবি হাতিম আর-রাযী (রহ.) (২৪০–৩২৭ হি.):
জারহ ওয়া তাদিলের রচয়িতা, ইমাম আবু হাতিমের পুত্র তার  কিতাবুল জারহ ওয়াত তাদিল (৫/২৩৩)-এ আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম সম্পর্কে ইমাম আহমদ ও ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈনের যঈফ আখ্যার বর্ণনা সংকলন করেছেন, যা পরবর্তী সকল মুহাদ্দিসের মূল তথ্যসূত্র।7

ইমাম আল-হাইসামী (রহ.) (৭৩৫–৮০৭ হি.):
মাজমাউয যাওয়ায়িদের রচয়িতা, হাদিসের উৎস ও রাবি বিশ্লেষণের বিশেষজ্ঞ মাজমাউয যাওয়ায়িদ ওয়া মানবাউল ফাওয়ায়িদ-এ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ সূত্রে আসা একটি সমর্থনকারী বর্ণনা উল্লেখ করে জানান: তার সনদে "আবু বিলাল আল-আশআরী" রয়েছেন যাকে দারাকুতনি দুর্বল বলেছেন। ফলে সেই শাহেদটিও হাদিসটিকে বিশেষভাবে "যোনীপথ উষ্ণ" অংশের জন্য শক্তিশালী করতে পারে না।8

শায়খ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রহ.) (১৯১৪–১৯৯৯ খ্রি.): 
বিংশ শতাব্দীর  মুহাদ্দিস, সিলসিলাতুস সহিহাহ ও সিলসিলাতুয যঈফাহর রচয়িতা  একাধিক যঈফ সনদ থাকায় পুরো হাদিসটি হাসান লি গাইরিহ  বলেছেন ।  [ কিন্তু   তার শর্ত অনুসারেই নির্দিষ্ট অংশ: وَأَسْخَنُ أَقْبَالاً অংশটি পৃথকভাবে যঈফ — কারণ এর জন্য কোনো স্বতন্ত্র শাহেদ নেই। ] 9 

“বাংলাদেশের কিছু গ্রন্থ ও ওয়েবসাইটে হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলা হয়েছে, যা শায়খ আলবানী (রহ.)-এর তাহকীক সঠিকভাবে না বোঝার ফল। তিনি মূলত হাদীসটির বিভিন্ন পৃথক সনদকে এককভাবে দুর্বল দেখিয়ে, সেগুলোর সমষ্টিগত শক্তির ভিত্তিতে একে ‘হাসান লি-গাইরিহি’ বলেছেন; ‘সহীহ’ বলেননি। আর ‘وَأَسْخَنُ أَقْبَالًا’ অতিরিক্ত শব্দাংশটি মূল সনদের অংশ নয়; এটি পৃথক রেওয়ায়েতে এসেছে এবং এর স্বতন্ত্র সমর্থন না থাকায় তা বাতিল ।”

অনুবাদের ভুল সংশোধন : 
ইবন মাজাহর সুনানে বর্ণিত হাদিসে¹ উল্লিখিত পদ وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا-এর অর্থ নিয়ে বাংলা অনুবাদে একটি গুরুতর ভুল প্রচলিত রয়েছে। কোনো কোনো অনুবাদক এটিকে "নির্মল জরায়ুধারী" বলে অনুবাদ করেছেন, আবার কেউ "যোনীপথ অধিক উষ্ণ" বলেছেন — যা থেকে আলোচিত অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছে। অথচ উভয় অনুবাদই ভাষাগত ও শাস্ত্রীয় উভয় দিক থেকে সম্পূর্ণ ভুল।
আরবি অভিধানশাস্ত্রে أَنْتَقُ শব্দটি نَتَقَ মূলধাতু থেকে গঠিত। ইবন মানযূর তাঁর লিসানুল আরব গ্রন্থে²10 এবং ইবনুল আসীর আন-নিহায়া গ্রন্থে11 একমত যে এই ধাতুর অর্থ সন্তান অধিক হওয়া এবং المرأة الناتق বলা হয় সেই নারীকে যার সন্তান বেশি। আল-ফাইরুযাবাদী তাঁর আল-কামুস আল-মুহিত গ্রন্থে12 এবং আল-যুবাইদি তাজুল আরুস গ্রন্থে13 এই অর্থই নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং أَنْتَقُ أَرْحَامًا বাক্যাংশের সঠিক ও অবিসংবাদিত অনুবাদ হবে "অধিক সন্তানধারিণী।"
এই অর্থটি হাদিসশাস্ত্রের আটজন প্রধান শারিহও গ্রহণ করেছেন। মাযহারুদ্দিন আয-যাইদানী আল-মাফাতিহ গ্রন্থে14, নাসিরুদ্দিন আল-বাইযাবী তুহফাতুল আবরার গ্রন্থে15, মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল আস-সান'আনী আত-তানওইর গ্রন্থে16, শারফুদ্দিন আল-হুসাইন আত-তাইবী শারহুল মিশকাহ গ্রন্থে17, আবুল-হাসান নুরুদ্দিন আস-সিনদী কিফায়াতুল হাজাহ গ্রন্থে18, মুল্লা আলি আল-কারী মিরকাতুল মাফাতিহ গ্রন্থে19, ইবনুল মালাক আল-কিরমানী শারহুল মাসাবিহ গ্রন্থে20 এবং মুহাম্মাদ আল-আমিন আল-হারারী মুরশিদ যাওইল হিজা গ্রন্থে21 — সকলে একবাক্যে এই পদের অর্থ "অধিক সন্তানধারিণী" বলে নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া আবদুর রউফ আল-মুনাবী ফায়যুল কাদীর গ্রন্থে22 এবং শুআইব আল-আরনাউত সুনান ইবন মাজাহর তাহকিকে23 একই অর্থ অনুমোদন করেছেন।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে ভাষাতত্ত্ব ও হাদিসশাস্ত্রের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য উভয়ই প্রচলিত ভুল অনুবাদগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণ করে। সঠিক ও শাস্ত্রসম্মত অনুবাদ হলো "অধিক সন্তানধারিণী।"

উপসংহার:

উপরিউক্ত বিস্তারিত আলোচনা থেকে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

প্রথমত, ইসলামবিরোধীদের তোলা "যোনীপথ অধিক উষ্ণ" অভিযোগটি সনদগতভাবে ভিত্তিহীন। যে বাড়তি অংশ (وَأَسْخَنُ أَقْبَالاً) থেকে এই অভিযোগের জন্ম, সেটি কেবল একটি মাত্র বর্ণনায় এসেছে এবং তার একমাত্র রাবি আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলামকে ইমাম আহমদ, ইয়াহইয়া বিন মাঈন, ইবনুল মাদিনী, নাসাই, আবু দাউদসহ হাদিসশাস্ত্রের প্রথম সারির সকল ইমাম সর্বসম্মতিক্রমে যঈফ বলেছেন। এই অংশের কোনো শাহেদ না থাকায় শায়খ আলবানীর শর্ত অনুসারেও এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত, মূল হাদিসের প্রধান সনদটিও শায়খ আরনাউতের তাহকিক অনুযায়ী দুর্বল। একাধিক দুর্বল সনদের সমষ্টিগত শক্তিতে হাদিসের মূল অংশটি হাসান লি গাইরিহি পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে — কিন্তু এই মর্যাদা কেবল সেই অংশের জন্য প্রযোজ্য যার জন্য শাহেদ রয়েছে; বিতর্কিত অংশটির জন্য নয়।

তৃতীয়ত, وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا পদের "নির্মল জরায়ুধারী" বা "যোনীপথ অধিক উষ্ণ" — উভয় অনুবাদই ভাষাগত ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ ভুল। আরবি অভিধানশাস্ত্র এবং আটজন হাদিস শারিহের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর একমাত্র সঠিক অনুবাদ হলো "অধিক সন্তানধারিণী।"

সুতরাং এই অভিযোগটি মূলত দুটি ত্রুটির সমষ্টি — একটি সনদগত দুর্বলতা এবং অপরটি অনুবাদগত অজ্ঞতা। শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনোভাবেই এটিকে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
 


  1. ⇧ সুনান ইবন মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদীস নং ১৮৬১ — উতবা ইবনু উআয়ম আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত
  2. ⇧ উক্ত হাদিসের রাবী ১. মুহাম্মাদ বিন তালহাহ আত তায়মী সম্পর্কে আবু হাতিম আর-রাযী বলেন, তার থেকে হাদিস গ্রহন করা যায় তবে তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। আবু হাতিম বিন হিব্বান বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় কখনো কখনো ভুল করেন। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি সত্যবাদী তবে হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫৩১২, ২৫/৪১৪ নং পৃষ্ঠা) ২. আব্দুর রহমান বিন সালিম বিন উতবাহ বিন উওয়ায়ম বিন সাইদাহ আল-আনসারী সম্পর্কে আবু হাতিম আর-রাযী ও ইমাম বুখারী বলেন, তার হাদিস বিশুদ্ধ নয়। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি মাজহুল বা অপরিচিত। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৩৮২৩, ১৭/১২৭ নং পৃষ্ঠা) উক্ত হাদিসটি সহিহ কিন্তু মুহাম্মাদ বিন তালহাহ আত তায়মী ও আব্দুর রহমান বিন সালিম এর কারণে সানাদটি দুর্বল। হাদিসটির ৪৪ টি শাহিদ হাদিস রয়েছে, তন্মধ্যে ৯ টি অধিক দুর্বল, ১৩ টি দুর্বল, ১০ টি হাসান, ১২ টি সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক ১০৩৪১, ১০৩৪২, মু'জামুল আওসাত ৪৫৫, ৭৬৭৭, শারহুস সুন্নাহ ২২৪৬ ইত্যাদি।
  3. ⇧ সুনান ইবন মাজাহ, আরনাওত তাহকিক, খ. ৩, পৃ. ৬৪–৬৫, টীকা নং ৪
  4. ⇧ আত-তালখিসুল হাবির (৫/২২৩৯)
  5. ⇧ আত-তালখিসুল হাবির, ৫/২২৩৯; তাহযিবুত তাহযিব, ২/৫০৭; তাহযিবুল কামাল, আল-মিযযী, ১৭/১১৪–১১৮ (ইবন হাজার সম্পাদিত)
  6. ⇧ তাহযিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল, ১৭/১১৪–১১৮
  7. ⇧ কিতাবুল জারহ ওয়াত তাদিল, ৫/২৩৩
  8. ⇧ আল-ইফসাহ ফি আহাদিসিন নিকাহ, পৃ. ৩০–৩১; মাজমাউয যাওয়ায়িদ
  9. ⇧ সিলসিলাতুস সহিহাহ, ২/১৯২–১৯৫; আস-সিরাজুল মুনির ফি তারতিব আহাদিস সহিহিল জামিইস সগির, আসাম মুসা হাদি, ১/৩১
  10. ⇧ ইবন মানযূর, লিসানুল আরব, দারু সাদির, বৈরুত, ১৪১৪ হি., খ. ১০, পৃ. ৩৫১।
  11. ⇧ ইবনুল আসীর, আন-নিহায়া ফি গারীবিল হাদীস, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৩৯৯ হি., খ. ৫, পৃ. ১৫।
  12. ⇧ আল-ফাইরুযাবাদী, আল-কামুস আল-মুহিত, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৫, পৃ. ৮৮০।
  13. ⇧ আল-যুবাইদি, তাজুল আরুস, মাতবাআতু হুকুমাতিল কুয়েত, ১৯৭৬, খ. ২৬, পৃ. ৩০০–৩০১।
  14. ⇧ আয-যাইদানী, আল-মাফাতিহ ফি শারহিল মাসাবিহ, দারুন নাওয়াদির, কুয়েত, ২০১২, খ. ৪, পৃ. ১৬।
  15. ⇧ আল-বাইযাবী, তুহফাতুল আবরার, দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪২৮ হি., খ. ২, পৃ. ৩৩৪।
  16. ⇧  আস-সান'আনী, আত-তানওইর, মাকতাবাতু দারিস সালাম, রিয়াদ, ২০১১, খ. ৭, পৃ. ২৮৩।
  17. ⇧ আত-তাইবী, শারহুল মিশকাহ, মাকতাবাতু নিযার মুসতাফা আল-বায, মক্কা, ১৪১৭ হি., খ. ৭, পৃ. ২২৬৪।
  18. ⇧ আস-সিনদী, কিফায়াতুল হাজাহ, দারুল জীল, বৈরুত, ১৪১৮ হি., খ. ১, পৃ. ৫৭৩।
  19. ⇧ আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতিহ, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২, খ. ৫, পৃ. ২০৪৮।
  20. ⇧ আল-কিরমানী, শারহুল মাসাবিহ, মাকতাবাতুল ইরশাদ, ইস্তাম্বুল, ১৪২৮ হি., খ. ৩, পৃ. ৫৪৪।
  21. ⇧ আল-হারারী, মুরশিদ যাওইল হিজা, দারুল মিনহাজ, জেদ্দা, ২০০৮, খ. ১১, পৃ. ৬০।
  22. ⇧ আল-মুনাবী, ফায়যুল কাদীর, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৪, খ. ৩, পৃ. ২৮৬।
  23. ⇧ আল-আরনাউত (তাহকিক), সুনান ইবন মাজাহ, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৯।